সিরাজগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে শীতলপাটি। জানা গেছে, জেলার কামারখন্দ, রায়গঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় শীতলপাটি তৈরি হয়। এখানকার তৈরি শীতলপাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে গেলেও এখন পুঁজির অভাবে সংকটে রয়েছে কারিগররা।
দেখা যায়, গরমের কয়েক মাস শীতলপাটির কদর বাড়ে। তাই কাজের ব্যস্ততাও অন্য সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। আগের তুলনায় শীতলপাটির কদর কম হলেও থেমে নেই তাদের পাটি তৈরির কাজ। শীতলপাটি বুনে তাদের সংসার চলে। জেলার কামারখন্দ উপজেলায় এখনো প্রায় শতাধিক পরিবার তাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। কিন্তু বেতের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি, পাশাপাশি পুঁজির অভাবে আজ এই শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে।
পাটিশিল্পের কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহুকাল ধরেই দেশে-বিদেশে এই জেলার শীতলপাটি সমাদৃত হয়ে আসছে। এখানকার ‘মুর্তাবেতির’ শীতলপাটির চাহিদাও প্রচুর। কামারখন্দ উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের মানুষ শীতলপাটি বুনে তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম পাটিশিল্প। তীব্র তাপেও খুব গরম হয় না বলেই এই পাটিকে শীতলপাটি বলা হয়।
পাইত্রা মুর্তা (স্থানীয়ভাবে পাটি বেত) নামে এক ধরনের বর্ষজীবী উদ্ভিদের কাণ্ড থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পরিপক্ব পাটিগাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তারপর পাটির বেতি তোলা হয়। এরপর ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে বেতি জ্বাল দেওয়া হয়। এর ফলে বেতি হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতির ওপরের খোলস থেকে শীতলপাটি, পরের অংশ তুলে বুকারপাটি এবং অবশিষ্ট অংশ চিকন দড়ি তৈরির কাজে ব্যবহূত হয়। বর্তমানে কামারখন্দ উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের অধিকাংশ পরিবার এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এরা সবাই পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখানে শীতলপাটি, নামাজের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। প্রায় ৯০ বছর বয়সি দুলাল চন্দ্র ভৌমিক জানান, ছোটবেলা থেকে তৈরি করে আসছেন এ শীতলপাটি। শীতলপাটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। বাবা-দাদারা পাটি বুনতেন। তাদের দেখে এ পেশায় জড়ান। তিনি আরো বলেন, এক সময় শীতলপাটির খুব কদর ছিল। তাদের কাছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার আসত। অনেক পাইকাররা তাদের থেকে পাটি কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করতেন। শ্রীমতি স্বপ্না রানী বলেন, ছোটবেলা থেকে পাটি বুনে আসছি। একজন মেয়ে সপ্তাহে একটি পাটি বুনতে পারে। এতে মজুরি আসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তিনি বলেন, এখন আমাদের শীতলপাটির কদর আগের মতো নেই। সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হলে এ শিল্প টিকে থাকবে।
এ ব্যাপারে পাটিশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিল্লু চন্দ্র দাস জানান, আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজ পুঁজির অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। করোনার আগে সোনালী ব্যাংক থেকে আমাদের লোন দেওয়া হলেও করোনার সময়ে বেচা-বিক্রি না থাকায় পুঁজি ভেঙে খাওয়ায় আমরা এখন দেউলিয়া হয়ে গেছি। অনেকেই এই পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। যারাও আছেন তারা ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগ না নিলে এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।