এমন ‘মারাত্মক ভুল’ কাম্য নহে

অভিধান অনুযায়ী ‘তদন্ত’ বলিতে সাধারণত কোনো কিছু অনুসন্ধান করা বা খুঁজিয়া বাহির করাকে বুঝায়। সাধারণত পুলিশ বা গোয়েন্দারা অপরাধী খুঁজিয়া বাহির করিতে তদন্ত করেন। ইহা ছাড়াও অনেক সময় কোনো বিষয়ে তদন্ত করিবার জন্য বিশেষ দল বা কমিটিও গঠন করা হয়। ইহাদের কাজই হইল তদন্ত করা, যেইখানে একজন তদন্ত কর্মকর্তা থাকেন; কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা যদি তদন্তের কাজে অবহেলা করিয়া থাকেন, তাহা হইলে উহা মারাত্মক ভুল। এই মারাত্মক ভুলের জন্য অপরাধীরা বিচারের বাহিরে চলিয়া যাইতে পারে।

এমন একটি মারাত্মক ভুলের ঘটনা ঘটিয়াছে হোসেনি দালানে শিয়া সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় জেএমবির দুই সদস্যকে গত পরশু ট্রাইবু্যনালে হাজির করিবার ক্ষেত্রে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হইয়াছে, সাত বত্সর পূর্বে পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা হয়, যেইখানে দুই জন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হইয়াছিলেন। পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে রাতে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় এই হামলার ঘটনা ঘটিয়াছিল। ট্রাইবু্যনালের বিচারক দেখিতে পাইলেন, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারাই বিচারের বাহিরে! এই আসামিদের চার্জশিটে অন্তভু‌র্ক্ত করেন নাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি দক্ষিণের পুলিশ পরিদর্শক। স্বাভাবিকভাবেই এই মারাত্মক ভুলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে ভর্ত্সনা করিয়াছেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইবু্যনালের বিচারক। রায়ে বিচারক বলিয়াছেন, তদন্ত কর্মকর্তা মারাত্মক ভুলের পাশাপাশি দায়িত্বে চরম অবহেলার পরিচয় দিয়াছেন। সেইখানে আরো বলা হয় যে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না করিয়া ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতাসহ গ্রেনেড হামলাকারীকে এই মামলায় আসামি হিসাবে অন্তভু‌র্ক্ত না করিয়া তদন্ত কর্মকর্তা মারাত্মক ভুল করিয়াছেন এবং চরমভাবে দায়িত্বে অবহেলার পরিচয় দিয়াছেন। ইহা ছাড়া কোনো প্রকার সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই কয়েক জনকে অযথাই আসামি করিয়া বিচারে সোপর্দ করিয়াছে। ফলে এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা এবং হামলাকারীরা আইনের আওতার বাহিরে রহিয়া গিয়াছে। কোনো প্রকার সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই তদন্ত কর্মকর্তা তাহার খামখেয়ালিপনার কারণে ঐ চার আসামিকে বিচারের আওতায় আনিবার ফলে ইহারা একদিকে যেমন হয়রানির শিকার হইয়াছেন তেমনি শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক কষ্টেরও শিকার হইয়াছেন। কেবল তাহাই নহে, শুধু আসামির সংখ্যা বৃদ্ধি করিবার জন্যই এদের চার্জশিটে অন্তভু‌র্ক্ত করেছে তদন্ত কর্মকর্তা!

তদন্েতর গুরুত্ব কতখানি তাহা বিশ্বের অনেক মনীষীই স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন বলিয়াছেন, ‘কনডেমনেশন বিফোর ইনভেস্টিগেশন ইজ দ্য হাইয়েস্ট ফর্ম অব ইগনোরেন্স। অর্থাত্ তদন্ত ঠিকমতো না করিয়া নিন্দা করা অজ্ঞতার সর্বোচ্চ রূপ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, তদন্ত মানেই যথাযথ তদন্ত। বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন যেমন বলিয়াছেন, দ্য হাইট অব ফুলিসনেস ইজ টু ডিসকার্ড অ্যান অপরচুনিটি উইদাউট আ ফুল (সম্পূর্ণ) ইনভেস্টিগেশন। একজন তদন্ত কর্মকর্তার রিপোর্টের গুরুত্ব এতটাই অধিক যে, তিনি পুরা বিষয়টি চাহিলে ম্যানিপুলেট করিয়া দিনকে রাত এবং রাতকে দিন করিয়া দিতে পারেন। পারেন বটে, তবে তাহা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচারকের বিচক্ষণতা এবং যাচাইয়ের লিটমাসে ঠিকই ধরা পড়িয়া যায়। ধরা পড়িয়া গেলে তাহা ঐ তদন্ত কর্মকর্তার জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয় হইয়া যায়। তদন্ত কর্মকর্তার উপর অর্পিত দায়িত্ব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, উহা যথাযথ বিচার পাইবার এবং অবিচার না-হইবার দিশা দিয়া থাকে। তিনি সেই দিশাকে ঘুরাইয়া দিতে পারেন না। তাহাকে আস্হায় আনিয়াই সরকার দায়িত্ব দিয়াছে। কেহ যদি তাহার উপর অর্পিত আস্হার ব্যত্যয় ঘটাইয়া থাকে তাহা হইলে উহা মুনাফেকি হইয়া যায়। কোনো কিছুকে গোপন রাখিয়া উহার বিপরীত কথা বলা তথা মুনাফেকি করাটা অত্যন্ত ঘৃণিত পাপ। যাহারা ইহকালে মুনাফেকি করিয়া অন্যের জন্য জাহান্নাম তৈরি করে, তাহারা কি পরকালে ভালো থাকিবে? মুনাফেকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকিবে। সুতরাং প্রত্যেকের উচিত তাহাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।