গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়নের অঙ্গীকার চাই

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রামগুলোতে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে শহরের উপর চাপ কমানো। আমার মনে হয়, সরকার সেই পথেই হাঁটছেন। রূপপুর পাওয়ার প্লান্ট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অনেক দেশি-বিদেশি অতিথির সঙ্গে আমিও ছিলাম। তখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের অনেকের এই বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা হয়। এবার নির্বাচনের মূল এজেন্ডা হিসেবে এ চিন্তাটি অসাধারণ। একটি মানুষের ম্যাটারিয়াল-ইমম্যাটারিয়াল দুইটি দিক বিচার করলে গ্রামের বিকল্প আর কী হতে পারে? মানুষ বাঁচে তার আবেগ আর অর্থের জোরে। গ্রামগুলোতে আবেগের জায়গা থাকলেও আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধাদি এখনো তেমন বাড়েনি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এবার গ্রামগুলোতে টেকনোলজির প্রয়োগসহ গ্রীন রেভিল্যুয়েশন ঘটানোর কাজটি করবেন প্রধানমন্ত্রী। এটা অত্যন্ত সময়োপযোগী, আধুনিক চিন্তা। ইউরোপের দেশগুলো অনেক আগেই এ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, ফলও ভোগ করছে তারা।

শহরের ভোগবিলাসী আয়েশী জীবনের প্রধান উত্সগুলোই আসে গ্রাম থেকে। গ্রামের মাছ, মুরগি, ডিম, হাঁস, কবুতর, গবাদিপশু, শাক-সবজি, চাল, ডাল থেকে শুরু করে জীবনরক্ষার প্রাণভাণ্ডার হচ্ছে আমাদের গ্রামগুলো। সেই গ্রামগুলোকে উপেক্ষা করলে সামগ্রিক উন্নয়ন কোনো দিনও সম্ভব নয়। আমাদের আধুনিক শহুরে সভ্যতায় পালিত পিঠা মেলা, বৈশাখী মেলা, লোকজ উত্সব এবং গ্রামীণ মেলাগুলো কিন্তু প্রাচীন ও চিরায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্য। কষ্ট হয়, গ্রামীণ সভ্যতা ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এই শহরে বাণিজ্য হলেও এর ছিটেফোঁটাও পৌঁছায় না গ্রামগুলোতে। আমরা কথায় কথায় গ্রামকে ভালোবাসার কথা বললেও বাস্তবে কতখানি ভালোবাসি সে প্রশ্ন থেকেই যায়। মুখে মুখে কৃষকদের উন্নয়নের কথা বললেও আসলে কতটুকু উন্নয়ন করেছি আমরা। তার প্রমাণ মেলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর আচরণে। বিদ্যুত্ বিল, গ্যাস বিল, নেট বিল, ডিস বিল, শিক্ষা, চাইনিজ খাবারের বিল বাড়লেও যেন সব সয়ে যায় আমাদের। কিন্তু গ্রামের শাক-সবজি, মাছ, মাংসের দাম বাড়লে আমাদের শহুরে জীবনে আগুন জ্বলে। শুক্রবার এলেই বাজার দর নামে সংবাদ পরিবেশনে মাঠে নেমে যান টেলিভিশনের সাংবাদিকরা। কিছু বুঝুক আর নাই বুঝুক কিছু পণ্যের দাম এই সাংবাদিকরা বাড়িয়ে দেন। অথচ বাড়তি দামের এক সিকিও পান না গ্রামের কৃষকেরা। এই শীতে মুলার কেজি দুই টাকা, গত সপ্তাহে দেখলাম এক মণ মুলায় এক কেজি চাল চাইছে কৃষকেরা। কিন্তু নগরে সেই মুলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে। এই চরম বৈষম্যর মূল কারণ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। এই দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে কৃষকদের ভাগ্য বদলাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীকে গ্রামে নিয়ে যেতে হবে। তাদের বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ করে দিতে হবে। আমার মনে হয়, এবারের নির্বাচনের ইশতেহার হওয়া উচিত পরির্বতন চাই। আর সেটা হবে মূল থেকে অর্থাত্ গ্রাম থেকে। গ্রামে সার্বিক সুবিধা বাড়িয়ে শহর ওপর চাপ কমাতে হবে।

অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ৮০ শতাংশের বেশি অকৃষি খাতের হলেও এর ৭১ শতাংশই এখনও গ্রাম বা পল্লীনির্ভর। ৭৮ লাখ ১৮ হাজার অকৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক ইউনিট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭১ দশমিক ৪৮ শতাংশই গ্রামভিত্তিক। তাই গ্রামের মানুষকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এখন অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ। তথ্যই বদলে দিতে পারে গ্রামীণ চেহারা, গতিবিধি, জীবনযাত্রা। চীনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চীনের ৯৯ ভাগ শহরে ইন্টারনেট আছে। অপরদিকে তাদের গ্রামগুলোতে মনিটরিং ও তথ্য কেন্দ্র থাকায় কৃষকেরা বাজার দর গ্রামে জেনেই অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে চার থেকে ছয়গুণ বেশি লাভ করতে পারছে। আমাদের দেশ ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে যাবে। গ্রামগুলো শহরের আলোয় আলোকিত হবে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরো প্রাণচঞ্চল করার জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নাই। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েও সমৃদ্ধ ও সচেতন হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটলে তরুণরাও হয়ে উঠবে কর্মউদ্দীপক। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে যে লাভ হবে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লাভবান হবেন যদি গ্রামে গিয়ে ওই টাকা বিনিয়োগ করা যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বাস করতেন, গ্রামের উন্নতির মধ্যেই সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভরশীল। কেননা আমাদের শহুরে জীবনের সব কিছুই গ্রাম থেকে আসা। তাহলে গ্রামের উন্নয়ন ঘটাতে পারলে দেশের উন্নয়ন ঘটবে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিপুল এ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্য কৃষিকে বহুমুখি করার বিকল্প নেই। তাই কৃষককে কী করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করা যায়, উত্পাদন বাড়াতে কিভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায়, কৃষকদের সন্তানকে কিভাবে শিক্ষা দেওয়া যায় ১০০ বছর আগে এ সব নিয়ে ভেবেছেন, কাজ করে গেছেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ রকম উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু ১৯৭৫-এর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের পর একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতায় গ্রামকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবেনি আর কোনো সরকার। এ বছরের মাঝামাঝি একটি বিশেষ দলকে ইউরোপের গ্রামীণ উন্নয়নসহ যাবতীয় বিষয় পর্যবেক্ষণে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। তিনি হয় তো চিন্তা করেছেন, গ্রামকে কীভাবে উন্নত করা যায়। শহরের সব সুবিধা গ্রামে পৌঁছাতে পারলে পাল্টাতে পারে জীবনযাত্রা। সেখান থেকে ফিরে দলটি জানান, ইউরোপের প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য আলাদা আলাদা বিশাল বড় বাড়ি তৈরি করা হবে যাকে আমরা আধুনিক শহরে কন্ডোমিনিয়াম টাইপের ভবন বলি। প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য থাকবে আলাদা আলাদা বিশাল ভবনের ভিত্তি। বাসাগুলো হবে অনেক খোলামেলা। কারণ কয়েকটা বড় বাড়িতেই ঢুকে যাবে পুরো একটি বড় গ্রাম। থাকবে গ্যাস, পানি, বিদ্যুত্, ইন্টারনেট, ক্লিনিক, মাঠসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা।

এবার আওয়ামী লীগ গ্রামকে নিয়ে বিস্তর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে। গ্রামে শহরের সুবিধা দিলে চাপ কমবে শহরে। গ্রামের জীবনযাত্রা উন্নত হবে। আওয়ামী লীগের এই কনসেপ্টটা আমার অত্যন্ত ভালো লেগেছে। গ্রামকে বানাবো শহর, কত্ত আধুনিক চিন্তা! এ ধরনের একটি শ্লোগান একটি জাতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কারণ, এ দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠী আধুনিকমনস্ক এবং পরিবর্তনের পক্ষে।

n লেখক : অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক