বইমেলার শেষদিকে মেলায় ঘুরতে গিয়েছিল দুই বন্ধু। মেলাপ্রাঙ্গনে সিসি ক্যামেরা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তারা।
‘যাক, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ভালো। কলকাতা বইমেলায় নাকি এক অভিনেত্রী অনেকেরই পকেট মেরে শেষে ধরা খেয়েছে!’
ঠিক তখনই তারা পড়ল এক পরিচিত এক কবির খপ্পরে।
‘পাইছি!’ আনন্দে আত্মহারা কবি।
‘ইয়ে মানে... আপনি আমাদেরকে দেখলেন কীভাবে? আমরা তো আপনার প্রকাশনীর ধারে-কাছেও যাইনি।’
‘কন্ট্রোলরুমে বসে ছিলাম। সিসি ক্যামেরায় দেখলাম তোমরা এদিক দিয়েই যাচ্ছ| এবার এসো, আমার বই কিনো।’
বইমেলায় গিয়ে জনৈক কবিকর্তৃক ‘পকেট মারিংয়ের’ শিকার দুই বন্ধু মনে কষ্ট নিয়ে এবার অন্য পথ ধরল।
‘এরপর থেকে মেলায় ছদ্মবেশ ধরে আসতে হবে, বুঝলি।’
‘শীতকালের মেলাই ভালো। মাফলার-টাফলার পেঁচিয়ে থাকা যায়। কেউ সহজে চিনতেও পারে না।'
‘আচ্ছা বলতো, ছেলেরা কখন কবি হয়ে ওঠে?’
‘যখন তাদের পক্ষে অন্য কিছুই হওয়া সম্ভবপর হয় না!’
এমন সময় সেই কবির বউয়ের সাথে তাদের দেখা হলো। তারা জানতে চাইল, ‘ভাবী, আপনার স্বামী তো কবি, কেমন লাগে?’
কবিপত্নী জানালেন, ‘বিরক্তির শেষ নেই! মন চায় হেরে কোনো মহিলা কবির সাথে বিয়া করিয়ে দিই। দুজনে মিল্লা সংসার করুক। কাঠালপাতা খাবে, গাছের মগডালে থাকবে।’
কবিপত্নীকে রেখে তারা হাটা শুরু করল অন্যদিকে। দেখতে পেল এক স্টলের সামনে হেভভি জটলা। তারা জানতে চাইল, ‘ভাই, এখানে এত জটলা কেন? কোনো সেলেব্রিটি লেখক এসেছেন বুঝি?’
পাশ থেকে একজন বলল, ‘মেলায় এখন পাঠকের চেয়ে লেখক বেশি। আর এই স্টলের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা সকলেই লেখক!’
‘এরা সবাই লেখক? এত লেখক মেলায় এসে করে কী?’
‘একজন আরেকজনের বই কেনে। সেলফি তোলে। ফেসবুকে ছবি দেয়। আবার সবার হাতে একটা করে বই দিয়ে ছবি তুলে লিখে— আজ অনেক বই বিক্রি হলো।’
‘সবাই বই কেনে?’
‘আরে নাহ। ছবি তোলার পর বই আবার স্টলে রেখে দেয়।’
‘প্রকাশকরা রাগ করে না?’
‘নাহ। প্রচারেই প্রসার কি-না| তাছাড়া, রাগ করার কী আছে, এরা তো সবই মুরগি-লেখক। প্রকাশককে অগ্রিম টাকা দিয়েছে বই বের করার জন্য। বই বিক্রি হোক বা নো-হোক, প্রকাশক নিশ্চিন্ত।’
‘আপনি এত কিছু জানলেন কী করে?’
লোকটা মুচকি হেসে বলল, ‘আমিই এই প্রকাশনীর প্রকাশক।’
দুই বন্ধু অবাক। জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, আপনার প্রকাশনীর সকলেই কি এমন মুরগি-লেখক?’
‘না, সেলেব্রেটি লেখকও আছে।’
‘তখনো কি এমন লাইন লেগে যায়?’
‘আরও বেশি। কারণ পাবলিক নামকরা লেখকের বই তো কেনেই, সঙ্গে সেলফির পর সেলফিও তোলে।’
‘কারণটা কী?’
‘দেখুন, বইমেলার পর নামকরা লেখকদের তো দেখা পাওয়াই কঠিন। মেলার সুযোগে অনেকেই সেলফি তুলে রাখে, যাতে সারা বছর সেই ছবি সবাইকে দেখিয়ে বলতে পারে— এই লেখক তার খুবই কাছের। এতই কাছের যে দুজনে একসাথে বসে বিড়িও ফুঁকে!’
প্রচুর ঘোরাঘুরির পর তাদের দুজনেরই খুব ক্ষুধা পেল। মেলার ভেতরে রেস্টুরেন্টের দেখা পেয়ে হালে পানি পেল ওরা। কিন্তু বিল দিতে গিয়ে চক্ষু ছানাবড়া।
‘এত বিল কেন?’
‘কী যে বলেন না স্যার, আমাদের মেন্যু-প্রাইজ রিজনেবল। বইমেলা বলে এত্ত কমে পাচ্ছেন। বাইরে গেলে তো...।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে বইমেলার নির্ধারিত ২৫% বা সম্ভব হলে ৪০% ডিসকাউন্ট দিন। আর হ্যাঁ, বিল কিন্তু সিক্যাশে পরিশোধ করব। সেখানেও দশ না-জানি কত পার্সেন্ট ক্যাশব্যাক পাওয়া যাচ্ছে।’
রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার তো অবাক!
পেটপূর্তি করে দুই বন্ধু আবারও ঘোরাঘুরি করতে লাগল। ঘোরাঘুরি বলতে বিভিন্ন স্টল থেকে ক্যাটালগ সংগ্রহ আর-কি!
এক স্টলে গিয়ে ক্যাটালগ চাইলে স্টলের বিক্রয়কর্মী জানাল, ‘ক্যাটালগ নাই।’
ঠিক তখনই পাশের আরেকজনের কাছে অন্য এক ব্যক্তি ক্যাটালগ চাইলে সে বের করে দিলো।
‘ওই যে ক্যাটালগ।’
‘আপনাদেরকে দেওয়ার মতো ক্যাটালগ শেষ।’
‘মানে কী?’
‘আপনারা যে ক্যাটালগ সংগ্রহ করে পরে সেগুলো কেজি দরে বিক্রি করবেন, সে আমি জানি।’
‘কী করে জানলেন?’
বিক্রমকর্মী মুচকি হেসে বলল, ‘আগের বছরগুলোতে আমিও এই কাজ করেছি কি-না!’
দুই বন্ধুও এবার না হেসে পারল না। ‘তাহলে এ বছর সংগ্রহ করছেন না কেন?’
‘এ বছর আমার বই বের হয়েছে।’
‘তো?’
‘প্রকাশক জানিয়েছে, এখন অব্দি এক কপিও বিক্রি হয়নি। মেলা শেষে এগুলো তো কেজি দরেই বিক্রি করে দিতে হবে, নাকি?’
‘বই বের হয়েছে, তাহলে সেখানে না গিয়ে এই স্টলে কাজ করছেন কেন?’
‘আমার বইটা এই স্টল থেকেই বেরিয়েছে। এখন বিনা-বেতনে বিক্রয়কর্মীর ভূমিকায় নেমে পড়েছি, যদি নিজের দু-চারটা বই বিক্রি করতে পারি, এই আর-কি!’
হাঁটতে হাঁটতে তারা একজনকে দেখল— এক ঝুড়ি বই মাথায় করে মেলা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।
‘সবাই মেলায় বিক্রির উদ্দেশ্যে বই নিয়ে আসে, আর আপনি নিয়ে যাচ্ছেন| তার মানে, এত্তগুলো বই সব আপনি কিনেছেন?’
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বাজারের কোনো খবর রাখেন আপনারা?’
‘কেন রাখব না? তেলের দাম বেড়েছে, পরোটা-সিঙ্গাড়ার সাইজ ছোট হচ্ছে দিনকে-দিন|’
‘গ্যাসের দামও যে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ডিজেলের দাম তো ক’মাস আগেই বাড়লো।’
‘কিন্তু বাজারের সাথে এই বাড়তি বই কেনার কী সম্পর্ক? দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পকেট ফাঁকা থাকার কথা। বই কেনার টাকা কই?’
‘এগুলো আমার প্রকাশনীর বই। বইবিক্রির খবরই নাই। মেলা শেষে সব তুলতে হবে গোডাউনে। সেখানে আবার গোডাউন ভাড়া। ইঁদুরগুলো বসে বসে দাঁতে ধার দিচ্ছে। ওদিকে, বাসায় চুলা জ্বলছে না। বইগুলো বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। জ্বালিয়ে কটা দিন ডাল-ভাত রান্না করে খাওয়া যাবে।’
দুই বন্ধু এবার গেল মঞ্চের দিকে। সেখানে বিভিন্ন বইয়ের মুরগি...থুড়ি মোড়ক উন্মোচন করা হচ্ছে। ভারি সিরিয়াল। দুই বন্ধু মঞ্চে উঠে আর নামল না সহজে। অন্যদের সাথে সাথে তারাও সেই মোড়ক উন্মোচনে অংশ নেয়। তাদের হাতেও তুলে দেওয়া হয় বই| তারা সেগুলো নিজেদের ব্যাগে চালান করে দেয়। এভাবে অনেক বইয়ে ভরে উঠল ব্যাগ। বেশ ভারীও হলো। সাথে বোনাস হিসেবে মিষ্টি, চকোলেট, নিমকি ইত্যাদি তো পাওয়া গেলই।
ভারী ব্যাগ নিয়ে হাঁটা কঠিন। এবার তাই তারা মেলা থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে দেখল, একজন প্রচুর পরিমাণে বই িকনছে।
‘ভাইজান, আপনি সেলফি-অটোগ্রাফ-ফটোগ্রাফ ছাড়া এভাবে কেজি ধরে বই কিনতেছেন যে?’
লোকটি বলল, ‘আরে ভাই, আমি একজন ঠোঙাওয়ালা। মেলায় আনা বইগুলান নতুন। এই বইয়ে ভালো ঠোঙা অয়, বুজলেন। তাই কিনে নিিচ্ছ।’
দুই বন্ধু মুচকি হেসে নিজেদের হাতের ব্যাগভর্তি বইগুলোও বাড়িয়ে ধরল; বলল, ‘দেখেন তো, এতে কতো টাকা আসে!’