দেশে করোনা পরিস্থিতি উন্নতি লাভ করিতেছে। করোনা লইয়া এখন আর তেমন আতঙ্ক নাই। ইহা একটি আশাব্যঞ্জক খবর নিঃসন্দেহে। স্বাস্হ্য অধিদপ্তর জানাইয়াছে, গত শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৭ হাজার ৪৫১টি নূতন নমুনা পরীক্ষায় মাত্র ৬২ জনের সংক্রমণ ধরা পড়িয়াছে। আর নূতন করিয়া কাহারও মৃত্যু হয় নাই। ইহার পূর্বে টানা তিনটি মৃত্যুহীন দিন কাটাইবার পর গত শুক্রবার দুই জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এখন আবার মৃত্যুহীন দেখা গিয়াছে। আমরা আশা করি, ভবিষ্যত্ দিনগুলিতে করোনা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হইবে; কিন্তু করোনা-পরবর্তী যেই সকল উপসর্গ ও জটিলতা দেখা দিতেছে তাহা লইয়া এখন নূতন করিয়া ভাবিতে হইবে। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হইবে। এই ধরনের চিকিত্সাকে প্রাধান্য দিয়া সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সতর্কতা জারি করা প্রয়োজন।
গতকাল ইত্তেফাকের একটি রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, করোনা-পরবর্তী নানা জটিলতায় ভুগিতেছে অধিকাংশ মানুষ। দেশের স্বনামধন্য চিকিত্সকরা বলিতেছেন, করোনা হইতে সুস্হ হইয়া উঠিলেও নিয়মিত চেকআপের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। হাসপাতাল হইতে ছাড়া পাইবার পর চিকিত্সক করোনা রোগীকে কতিপয় টেস্ট দিয়া থাকেন; কিন্তু দেখা যায়, অধিকাংশ রোগী সময়মতো সেই টেস্টগুলি আর করেন না। এইভাবে অবহেলা ও অলসতার কারণেও কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে যেই সকল শারীরিক সমস্যা ও জটিলতা দেখা দিতেছে তাহা হইল :অবসাদ বা ক্লান্িত বোধ হওয়া, দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা, স্মৃতিশক্তি কমিয়া যাওয়া, হাত-পাসহ বিভিন্ন অঙ্গ অবশ হওয়া, ঝিঁঝি লাগা, মাংসপেশি ও হাড় বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, কোমরে ও মেরুদণ্ডে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ, অরুচি, অস্থিরতা ইত্যাদি। সবচাইতে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হইল, ইহার কারণে লিভার, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস ইত্যাদির সমস্যাও তৈরি হয়। যেহেতু এই সমস্ত রোগ মারাত্মক এবং একজন রোগীকে দীর্ঘদিন ধরিয়া ভোগায়, তাই করোনা-পরবর্তী যে কোনো জটিলতাকে অবহেলা করিবার কোনো অবকাশ নাই। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলিতেছেন, করোনা ভাইরাস রক্ত সঞ্চালন ও স্নায়ুতন্ত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া থাকে। নিজেকে বাহ্যিকভাবে সুস্হ মনে হইলেও পরীক্ষানিরীক্ষা করিলে লিভার সিরোসিসসহ নানা জটিলতা ধরা পড়িতেছে। সমস্যা হইতেছে ব্রেনেও। কেহ কেহ প্যারালাইসিসের শিকার হইতেছেন। আইবিএসসহ পরিপাকতন্ত্রে নানা সমস্যা দেখা দিতেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন ফলাফল পাওয়া গিয়াছে।
গতকাল প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী আমাদের দেশে এই পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হইয়াছে ১৯ লক্ষ ৫০ হাজার ৫২৭ জন। ইহাতে মোট মৃত্যু হইয়াছে ২৯ হাজার ১১৪ জনের। মোট সুস্হ হইয়াছেন ১৮ লক্ষ ৬৯ হাজার ৬৩৪ জন। সুস্হতার হার অধিক হইলেও ইহাতে আমাদের আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগিবার কিছু নাই। কেননা, যাহারা সুস্হ হইয়াছেন, তাহারা আসলে কতটা সুস্হ? তাহারা নূতন করিয়া করোনা-পরবর্তী জটিলতায় ভুগিতেছেন না তো? আমরা মনে করি, এই পর্যায়ে আসিয়া আমাদের এই ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন রহিয়াছে। সংবাদপত্র ও রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রচারণা দরকার। যাহারা কোনো সমস্যা অনুভব করিতেছেন, তাহাদের উচিত দেরি না করিয়া চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া। বিভিন্ন হাসপাতালে যাহারা এমন সমস্যা লইয়া আসিবেন, তাহাদের চিকিত্সায় বিশেষ যত্ন লওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, শিক্ষা ও স্বাস্হ্য খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে জনসম্পদকে জনশক্তিতে পরিণত না করিতে পারিলে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হইবে না। এই জন্য করোনা-পরবর্তী স্বাস্হ্যসচেতনামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের এখনই সময়।