সিরাজগঞ্জ থেকে কালের আবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে নকশি কাঁথা। এক সময় জেলার বিভিন্ন উপজেলার খেটে খাওয়া পরিবারের দলবদ্ধ গৃহবধূ ও কিশোরীদের হাতের ছোঁয়ায় নতুন এবং পুরাতন কাপড় দিয়ে তৈরি হতো নিত্য নতুন নকশি কাঁথা। এই কাঁথায় সুই আর সুতা দিয়ে তাদের হাতের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলা হতো নানা রঙের নকশা।
অতীতে বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্ঠানে বরযাত্রীদের বসতে দেয়া হতো খড়ের উপর পাটের চট বিছিয়ে। আর বর আর তার সঙ্গী কোলদারদের বসতে দেয়া হতো কাঁথার উপর চাদর বিছিয়ে। এখন সেই বসার আসন দখল করেছে ছোফাসেট, চেয়ার , টেবিল সহ আধুনিককালের আসবাবপত্র। তাছাড়া কন্যার দাদী নানীরা তাদের নতুন নাতিন জামাইকে উপহার হিসেবে দিতেন কাঁথা আর বালিশ। প্রতিটি বাড়ীর বিছানায় বিছানো থাকতো কাঁথা, ধর্নাঢ্যদের কাঁথার উপর থাকতো চাদর। শীত মৌসুমে লেপের নিচে ব্যবহারও করা হতো এই কাঁথা। এছাড়াও জন্মলগ্ন থেকে ছোট ছোট শিশুদের প্রতিপালনের জন্য ধনী ও দরিদ্র পরিবারের সকলেই কাঁথা ব্যবহার করতো। যা নিত্যদিনই পুকুরে পরিস্কার করে রোদে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে শুকানো হতো।
তবে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে ব্যক্তি উদ্যোগে কাজ করছেন অনেকে। এদের মধ্যে সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার চররায়পুর মহল্লার আসমা বেগম। তিনি গত প্রায় ১ বছর আগে স্থানীয় অসহায় নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন শেফা বুটিক হাউজ। যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ধরনের নকশি কাঁথা তৈরি করেন। এর চাহিদাও রয়েছে দেশ জুড়ে বলে জানা গেছে।
কামারখন্দ উপজেলার কর্নসূতি গ্রামের বয়োবৃদ্ধা জইফুল বেওয়া (৯০) বলেন, 'বাবারে হেই দিন আর নাই। খ্যাতাও নাই হুকানের জাগাও নাই। ব্যাক জায়গায় পাহা ঘর বানাইছে।'
বারাকান্দি গ্রামের সুফিয়া বেগম (৭২) বলেন, 'একখ্যান বড় খ্যাতা সিলাই করতে প্রায় ১ মাস সময় নাগছে। আর আমরা সিলাই করে মুজুরি পাছি ২ ট্যাহা। এহুন চোহেও দেহিনা খ্যাতাও হিয়াই না।'
কাজীপুর উপজেলার নাটুয়াপাড়া চরের নাটুয়াপাড়া গ্রামের ছালমা (৭০), কদবানু (৬৫), বাহাতন (৭২) বলেন, 'আগে এই খ্যাতা সিলাই কইরা সংসার চালানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করা গেছে। এহুন দেশি বিদেশী কম্বল, ন্যাপ তোষক আসায় এই খ্যাতা আরায়া গ্যাছে বাবা। এহুন এ সব খ্যাতা সংসারের কাজের ফাকে ফাকে নিজেগোরে ব্যবহারের জন্য আমরা সেলাই করছি। তাও আগের মতো পারি না।'
অতীতের স্মৃতিচারণ করে সদর উপজেলার রায়পুর গ্রামের আয়শা বেওয়া (৮০) বলেন, 'আগে খ্যাতা হিয়াইছি। কামের ফাকে ফাকে দুই চার আনা কামাই করছি। যা বিপদে আপাদে আমাগোরে বাড়ীয়ালার আতে তুইলা দিছি।'
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ শহরের শেফা বুটিক হাউজের সত্ত্বাধিকারী আসমা বেগম বলেন, 'প্রাচীন ঐতিহ্য এই নকশি কাঁথা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই তিনি এলাকার অসহায় নারীদের একত্রিত করে এবং প্রায় ১ বছর আগে নকশি কাঁথা সেলাই শুরু করেন। প্রথম দিকে তেমন সাড়া না পেলেও এখন বেশ সাড়া পাচ্ছেন। তার তৈরি নকশি কাঁথা ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে যাচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্পকে আরো অনেক দুর এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।'