সিরাজগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে নকশিকাঁথা

সিরাজগঞ্জ থেকে কালের আবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে নকশিকাঁথা। এক সময় জেলার বিভিন্ন উপজেলার গৃহবধূ ও কিশোরীদের হাতের ছোঁয়ায় নতুন এবং পুরোনো কাপড় দিয়ে তৈরি হতো নকশিকাঁথা। এই কাঁথায় সুই আর সুতা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হতো নানা রঙের নকশা। 

অতীতে বিয়ের অনুষ্ঠানে বরযাত্রীদের বসতে দেওয়া হতো খড়ের ওপর পাটের চট বিছিয়ে। বর আর তার সঙ্গীদের বসতে দেওয়া হতো কাঁথার ওপর চাদর বিছিয়ে। এখন সেই বসার আসন দখল করেছে সোফাসেট, চেয়ার, টেবিলসহ আধুনিককালের আসবাপত্র। তা ছাড়া কন্যার দাদি-নানিরা নতুন নাতিন জামাইকে উপহার হিসেবে দিতেন কাঁথা আর বালিশ। প্রতিটি বাড়ির বিছানায় বিছানো থাকতো কাঁথা, ধনাঢ্যদের কাঁথার ওপর থাকতো চাদর। শীতের মৌসুমে লেপের নিচে ব্যবহারও করা হতো এই কাঁথা। এ ছাড়াও জন্মলগ্ন থেকে ছোট শিশুদের প্রতিপালনের জন্য ধনী ও দরিদ্র পরিবারের সবাই কাঁথা ব্যবহার করতো। 

প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করছেন অনেকে। তাদের মধ্যে সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার চররায়পুর মহল্লার আসমা বেগম। এ ব্যাপারে কামারখন্দ উপজেলার কর্নসূতি গ্রামের বয়োঃবৃদ্ধা জইফুল বেওয়া (৯০) জানান, আগের দিন আর নাই। কাঁথাও নাই, শুকানোর জায়গাও নাই। সব জায়গায় এখন পাকাঘর। বারাকান্দি গ্রামের সুফিয়া বেগম (৭২) বলেন, ‘একখ্যান বড় খ্যাতা সিলাই করতে প্রায় ১ মাস সময় নাগছে। আর আমরা সিলাই করে মুজুরি পাছি ২ ট্যাহা। এহুন চোহেও দেহি না খ্যাতাও হিয়াই না।’

কাজীপুর উপজেলার চরের নাটুয়াপাড়া গ্রামের ছালমা (৭০), কদবানু (৬৫), বাহাতন (৭২) বলেন, ‘আগে এই খ্যাতা সিলাই কইরা সংসার চালানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করা গেছে। এহুন দেশি-বিদেশি কম্বল, ন্যাপ তোষক আসায় এই খ্যাতা আরায়া গ্যাছে। এহুন এসব খ্যাতা সংসারের কাজের ফাকে ফাকে নিজেগোরে ব্যবহারের জন্য সেলাই করছি। তাও আগের মতো পারি না।’ এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ শহরের শেফা বুটিক হাউজের স্বত্বাধিকারী আসমা বেগম জানান, প্রাচীন ঐতিহ্য এই নকশিকাঁথা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই তিনি এলাকার অসহায় নারীদের একত্র করে প্রায় এক বছর আগে নকশিকাঁথা সেলাই শুরু করেন। প্রথম দিকে তেমন সাড়া না পেলেও এখন বেশ সাড়া পাচ্ছেন। তার তৈরি নকশিকাঁথা ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে যাচ্ছে। সহযোগিতা পেলে এই শিল্পকে আরো অনেকদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।