অতীতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বিজ্ঞাপন চালু ছিল। বলা হইত, প্রচারেই প্রসার। এখনো যে নাই তাহা বলা যাইবে না। তবে বর্তমানে বড়বড় এবং সত্যিকারে চাহিদা আছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলি বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে অধিক মনোযোগী নহে, বরং তাহারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য অথবা নিজেদের তৈরি যে কোনো সামগ্রীর মানের দিকে অধিক গুরুত্ব দিয়া থাকেন। পণ্যের মানই বিজ্ঞাপন হইয়া দাঁড়ায়। ইহা সর্বক্ষেত্রে সত্য। কোনো ব্যক্তি জ্ঞানী হইলে তাহাকে বলিয়া বেড়াইতে হয় না যে আমি জ্ঞানী। তাহার জ্ঞান নিঃশব্দে আলো ছড়ায়। কোনো রাজনীতিবিদ যদি জনগণের জন্য কল্যাণমূলক কিছু করেন তাহা জনগণের চোখে পড়ে। এমনকি কোনো পেশাজীবী যদি তাহার কাজে কর্মদক্ষ হন, তাহা হইলে তাহার কর্মস্থলেও আপনা-আপনিই ছড়াইয়া পড়ে। তবে প্রচারের যে প্রয়োজন নাই উহাও বলা যাইবে না।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে জানান দিতে হয় বইকি। কিন্তু তাহা করিতে গিয়া মিথ্যাচারের আশ্রয় লওয়া কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নহে। না ব্যক্তির জন্য, না প্রতিষ্ঠানের জন্য। মিথ্যাচার করিলে কেবল ভাবমূর্তিই নষ্ট হয় না, নিজেদের জবাবদিহিতার জায়গাও দুর্বল হইয়া পড়ে। মিথ্যাচারের নানা রকমফের রহিয়াছে। আমরা বহু রঙের, বহু আকারের মিথ্যাচার দেখিয়া থাকি। সুইট লাই বা মিষ্টি মিথ্যা এবং বিটার ট্রুথ বা তিক্ত সত্য বলিয়া কথা চালু আছে। আবার হোয়াইট লাই বা নির্দোষ মিথ্যা বলিয়াও একটি কথা চালু রহিয়াছে। যে মিথ্যা বলিলে কাহারো ক্ষতি হয় না, নিজেও লাভবান হয় না তাহাকেই নাকি হোয়াইট লাই বলে। বিভিন্ন দেশে এমন মিথ্যাচারের নাকি বিচারও নাই। কিন্তু যাহাই হউক, মিথ্যা তো মিথ্যাই। উহা কেহ লাভের জন্যই করুক, অন্যের ক্ষতির জন্যই করুক অথবা নির্দোষভাবেই করুক।
আমরা আমাদের চারিপাশে যেই মিথ্যাচার দেখিয়া থাকি তাহা কিন্তু নিজের অথবা প্রতিষ্ঠানের অথবা গোষ্ঠীর স্বার্থেই করা হইয়া থাকে। মিথ্যাচারের সুবিধা হইল, সমাজের একটি অংশকে তাহা বিশ্বাস করানো যায় এবং ফায়দা আদায় করা যায়। এই সম্পর্কে অবশ্য বিজ্ঞান একটি সমাধান দিয়াছে। বিজ্ঞানী, মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন, আমরা সকল কিছু চাক্ষুষ করিয়া তাহার ভিত্তিতে বিচার করিয়া থাকি। আমাদের মস্তিষ্কের বিশাল অংশ নিয়োজিত রহিয়াছে দৃষ্টিগোচরের কাজে। সুতরাং তাহারা চক্ষু মুদিয়া কর্ণ তীব্র করিয়া কথা শুনিতে পরামর্শ দেন। তাহারা বলিয়া থাকেন, মানুষের একটি ইন্দ্রিয় অকার্যকর থাকিলে অন্য ইন্দ্রিয় তীব্র হইয়া থাকে, মস্তিষ্কও সূক্ষ্মভাবে কাজ করিতে পারে।
সে যাহাই হউক, মিথ্যাচার, মিথ্যা প্রচার শুধু অন্যায়ই নহে, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বিচারেও গর্হিত। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলিয়াছেন, মিথ্যা কখনো বাঁচিয়া থাকে না, উহার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু যাহারা মিথ্যাচার করেন, মিথ্যা প্রচার করিয়া থাকেন তাহাদের মধ্যে এই বোধটি থাকে না। পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মই মিথ্যাচারকে গুরু অপরাধ বলিয়া সতর্ক করিয়াছে। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে ইরশাদ করা হইয়াছে, ‘মিথ্যা তো তাহারাই বানায় যাহারা আল্লাহর প্রতি ইমান রাখে না। বস্তুত তাহারাই মিথ্যুক (সুরা নাহার, আয়াত : ১০৫)।’ মিথ্যা প্রচার করিয়া মানুষ সাময়িকভাবে লাভবান হইতে পারে বটে, কিন্তু কালের বিচারে তাহা আস্তকঁুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। ইতিহাস হইতে আমরা তাহা দেখিয়া থাকি। তবে ইহাও ঠিক, সত্য সকল সময় উচ্চারণ করা যায় না। তাহাতে সমূহ বিপদেরও আশঙ্কা থাকে। এই সকল ক্ষেত্রে চুপ করিয়া থাকাই শ্রেয়।