রোজার উদ্দেশ্য ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

আহলান সাহলান ইয়া মাহে রমাদান। স্বাগত মাহে রমজান। রমজান শব্দের অর্থ দহন করা। মুসলমানদের পাপ-পঙ্কিলতা জ্বালাইয়া-পোড়াইয়া দিতে আগমন ঘটে মাহে রমজানের। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ হইতে দেশে শুরু হইল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাসব্যাপী মাহে রমজানের পবিত্র সিয়াম সাধনা। 

আরবি সিয়াম শব্দটি ‘সাওম’ শব্দের বহুবচন। অর্থ রোজাসমূহ। রোজা শব্দটি উর্দু ও ফারসি। সুবেহ সাদিক হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার হইতে বিরত থাকিবার নামই সাওম বা রোজা। ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি-ইমান, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। পরের দুইটির সহিত আর্থিক বিষয় সংশ্লিষ্ট বিধায় ইহা শুধু ধনবান ও সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। 

একজন গরিব মুসলমান ইমান, নামাজ ও রোজার হক আদায়ের মাধ্যমে ইহ ও পরকালে কামিয়াব হইতে পারেন। তাহার উপর আর্থিক কোনো দায়বদ্ধতা নাই। বরং তাহারা সাদাকাতুল ফিতরা, জাকাত ও দানখয়রাত হইতে লাভবান হন।

রোজা ইসলামের এক অনন্য ইবাদত। কেননা, ইহা কেবল আল্লাহর জন্যই এবং আল্লাহ নিজেই ইহার প্রতিদান দিবেন। আল্লাহকে হাজির-নাজির জানিবার কারণে রোজাদারগণ সংগোপনেও পানাহার করেন না। কেহ গায়ে পড়িয়া ঝগড়াবিবাদ করিতে আসিলেও তিনি নির্লিপ্ত থাকিয়া বলেন, ‘আমি রোজাদার’। আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে বলিয়াছেন, ‘হে ইমানদার বান্দাগণ, নিশ্চয়ই তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হইয়াছে। যেমনটি ফরজ করা হইয়াছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাহাতে তোমরা খোদাভীতি অর্জন করিতে পারো (আল বাকারা-১৮৩)। রোজা আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর আমল হইতেই প্রত্যেক নবি-রাসুলের জমানায় ফরজ ছিল। পার্থক্য ছিল শুধু রোজা রাখিবার সংখ্যা ও সময়কালের মধ্যে।

মাহে রমজান হইল মুমিন মুসলমানদের প্রশিক্ষণের মাস। এই প্রশিক্ষণের প্রতিফলন বাকি ১১টি মাসে থাকা প্রয়োজন। যদি আমরা রোজার হক আদায় না করি এবং ইহার মাধ্যমে পরহেজগার ও মুত্তাকি না হইতে পারি, তাহা হইলে আমাদের শুধু উপোস থাকাটাই সার হইবে। এই জন্য রসুলুল্লাহ (স.) বলিয়াছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তাহার এই পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নাই’ (বুখারি-১৯০৩)। রোজা হইল ঢালস্বরূপ। ইহা মানুষকে অন্যায়-অপকর্ম ও যাবতীয় পাপাচার হইতে মুক্ত রাখে। মুক্ত রাখে পরকালে জাহান্নামের আগুন হইতে। 

তবে ইহার মূল উদ্দেশ্য হইল তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। আমরা আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি। সুতরাং তাহাকে ভয় করিতে হইবে কেন? আসলে তাকওয়ার অর্থ প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করিবার বিশেষ শক্তি অর্জন করা। আরবি ভাষাবিদদের মতে, তাকওয়া শব্দের মৌলিক অর্থ দুইটি—এক. সংরক্ষণ ও দুই. পরিহার। ব্যক্তি পার্থিব ও অপার্থিব সব ক্ষতির বিষয় পরিহারের মাধ্যমে নিজেকে সংরক্ষণ করিলে তাহাকে মুত্তাকি বা আল্লাহভীরু বলা হয়। এই জন্য রোজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হইল মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাহার ভিতরের ফেরেশতাসুলভ বৈশিষ্ট্য জাগ্রত করা। 

শরীরের ও আত্মার চাহিদা এক নহে। আত্মার খোরাক হইল পরমাত্মামুখী হওয়া। রোজার মাধ্যমে আমরা যে ধৈর্য, সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সৎসাহস ও নিরঙ্কুশ আনুগত্যের দীক্ষা লাভ করি, তাহাতে এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করিবার দুর্বার শক্তি অর্জিত হয়। এই জন্য রোজা হইল আত্মিক ব্যাধির দাওয়াই। ইমাম গাজ্জালি (রহ)-এর মতে, মানুষ যখন তাড়নার উপর বিজয়ী হয়, তখন সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাইয়া যায় এবং তাহার মর্যাদা ফেরেশতার উপর উন্নীত হয় ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দিন।’ রোজা রাখিবার গুরুত্ব এ কারণেই সর্বাধিক।

অতএব, চিরস্থায়ী জীবনের জন্য আত্মশুদ্ধি অর্জনই হউক আমাদের রোজা রাখিবার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ আমাদের মাহে রমজানের এক মাস রোজা সহিহ-সালামতে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পালন করিবার তওফিক দান করুন। আমিন।