কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি এবং বাড়তি অর্থ ব্যয়ের কারণে গুচ্ছ পদ্ধতিতে আগ্রহ কমছে বিশ্ববিদ্যালয়-গুলোর। সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে কৌশল খুঁজে বের না করা পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে যেতে চায় না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বারের মতো ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া গুচ্ছের বাইরে থাকা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবারও এই পদ্ধতিতে আসছে না। ইতিমধ্যে তারা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গুচ্ছ পদ্ধতি চালুর সময়ে সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, যারা এই গুচ্ছে নেই, অভিষ্যতে তারাও আসবে। কিন্তু খোদ গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে চাইছে।
এই পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা কার্যক্রমের নেতৃত্বে ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু খোদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ই ২০২১-২২ অংশগ্রহণ করবে কি না, তা নিয়েই সংশয় রয়েছে। এছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এককাট্টা হয়েছে এই প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য। গুচ্ছ পদ্ধতি শিক্ষার্থীবান্ধব নয়, এমন অভিযোগ তুলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে ভর্তির দাবি তুলেছে।
দেশে অনুমোদিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৫২টি। ২০টি সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) একটি গুচ্ছভুক্ত হয়ে গত বছর প্রথম বারের মতো গুচ্ছ ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছে। এ ছাড়া কৃষি ও কৃষিপ্রধান সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়েছে।
শিক্ষাথীর্দের ভোগান্তি কমাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পদ্ধতিতে ভোগান্তি কমেনি। শিক্ষার্থী অর্থ ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। একবার গুচ্ছ ভর্তিতে আবেদনের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। তারপর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথকভাবে আবেদনের জন্য আবার ৪০০ বা ৬৫০ টাকা দিতে হয়েছে শুধু একেকটি ইউনিটে। এ ছাড়া মৌখিক পরীক্ষা দিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমবেশি আসন খালি রয়েছে এখনো। অর্থাৎ আসন খালি রেখেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে বহুবার সাক্ষাত্কার নিয়েও ভর্তি সম্পন্ন করতে পারেনি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়।
১০টি মেধাতালিকা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী না পাওয়ায় ১৫০টি আসন ফাঁকা রেখেই ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিন্ডিকেট সদস্য ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় খুব কম সময়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পেরেছিল নিজস্ব ভর্তি পদ্ধতির জন্য। কিন্তু গুচ্ছে নানা অসংগতি ছিল। এর প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেকটা পিছিয়ে গেছে। এবার শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও এটি ফুটে উঠেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ইতিমধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে।
শিক্ষকরা বলেন, গুচ্ছ পদ্ধতিতে যে সুবিধার কথা তারা বলেছিলেন, সে সুবিধা আমরা পাইনি। বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বেড়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় জানুয়ারিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে এখনো শেষ করতে পারেনি। মূলত শিক্ষার্থীদের আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক দুর্ভোগ লাঘবের জন্য গুচ্ছ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলেও পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতারা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, গুচ্ছ পদ্ধতি শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। ১৫ বার মেধাতালিকা প্রকাশ করার পরও প্রতিটি বিভাগেই আসন খালি রয়েছে। এতে সেশনজট লেগেই থাকবে।
গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষার টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর ইত্তেফাককে বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। আগামী ৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে এ বিষয়ে বৈঠক হবে। ঐ বৈঠক থেকে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সম্প্রতি এক আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ভর্তি পরীক্ষায় হয়রানি কমাতে আমরা গুচ্ছ পদ্ধতির কথা বলেছি। একটা সিস্টেম যখন চালু হয় তখন কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতেই পারে। আমি প্রথম বার চেষ্টা করছি সেখানে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়তো রয়েছে। এসব ত্রুটিকে আমরা আগামীতে আশা করি দূর করতে পারব। তাই গুচ্ছ পদ্ধতিকে আরো সংহত করতে হবে। এ সময় এটা থেকে দূরে না যেতে অনুরোধ করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি।
তবে ভোগান্তির কারণসহ নানা সমস্যা খুঁজে বের করে এই গুচ্ছে থাকা উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, খুব সহজেই এর সমাধান করা যায়। নীতিমালা সংশোধন করে কৃষি ও কৃষিশিক্ষাপ্রধান সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এই ২০ বিশ্ববিদ্যালয়েও কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্ধারণ করে দিয়ে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। মেডিক্যাল কলেজের বিষয়টিও বলেন তিনি। দেশে স্নাতক (সম্মান), স্নাতক (পাশ) ও সমমানের কোর্সে প্রথম বর্ষে ভর্তিযোগ্য আসন আছে ১৩ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন আছে ৬০ হাজারের সামান্য কমবেশি।