রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর পপুলার ডায়াগনস্টিকের সামনের সড়কের বিপরীতে তিনতলা একটি ভবন ভাড়া নিয়ে চলছে ‘মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টার’, হোটেল ‘সী আলিফ’ ও ‘তাজমহল’-এর ব্যবসা। ভবনটির প্রবেশ পথের ডান পাশের ফুটপাত দখল করে চা-সিগারেটের ব্যবসা করছেন এক যুবক। নাম রাসেল। তার ঐ দোকানটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। নিজের পেছনের তিনতলা ঐ ভবনটির মালিক রাসেলই। তবুও তিনি ফুটপাত দখল করে চায়ের স্টল দিয়ে বসেছেন। এই চিত্র পুরো নগরীর। গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কের ফুটপাত এমনকি সড়কও অবৈধভাবে দখলে চলে গেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ফুটপাতে মাসে কোটি টাকার চাঁদা আদায় করছে এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক একটি প্রভাবশালী চক্র। এছাড়া ফুটপাতে কৌশলে চলে মাদক ব্যবসাও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফুটপাত ও সড়ক অবৈধভাবে দখল করে অনেকে ব্যবসা করছেন। কেউ দখল করে ভাড়ায় খাটাচ্ছেন। এসব স্থানে চা-সিগারেট, মুদি, কাপড় কিংবা অন্য দোকানের আড়ালে অনেকে করছেন মাদক কারবারও। পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কৌশলে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল প্রভৃতি মাদকদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। এই চিত্র মহানগরের সাহেব বাজার, গণকপাড়া, শিরোইল বাসটার্মিনাল, ভদ্রা, কোর্ট স্টেশন, তালাইমারী, বিনোদপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাত ও সড়কের। এসব দখলদারদের কারণে ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের হাঁটার কোনো উপায় নেই। উপরন্তু সড়কের একাংশ দখল করে রাখা হয় কার-মাইক্রোবাস। পথচারীরা বাধ্য হয়ে চলেন সড়কের মাঝখান দিয়ে।
গত ১৫ মার্চ নগরীতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার দিবসের আলোচনায় একজন পথচারী বিষয়টি তুলে ধরেন। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার জি এস এম জাফরউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ঐ পথচারী বলেন, ‘আমি ট্যাক্স দিই। আমার টাকায় ফুটপাত বানানো হয়। কিন্তু আমি ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ পাই না।’ রাজশাহী মহানগরীর অধিকাংশ এলাকায় টাইলস বসানো দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাত মানুষের হাঁটাচলার জন্য উন্মুক্ত থাকছে না। হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের প্রয়োজনে ফুটপাত দখল করে নিচ্ছেন। শুধু এরাই নয়, ফুটপাত দখল করে স্হায়ী কিংবা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করেছে পুলিশও। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দল ও অঙ্গ-সংগঠনের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে ফুটপাতে। শহর ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
সাহেববাজারে দেখা যায়, সড়কের দুপাশের ফুটপাতের পুরোটাসহ সড়কের অর্ধেক পর্যন্ত দখলে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। শিরোইলে ঢাকাবাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফুটপাতের ওপর গড়ে উঠেছে ফল, কনফেকশনারি, চা, কালাইরুটি, পুরি, শিঙাড়া, পুরোনো জুতা ও কাপড়ের দোকান। এখানে ফুটপাত দখল করে ট্রাফিক পুলিশের একটি অস্থায়ী চৌকিও চোখে পড়ে। নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়ে ফুটপাতের ওপরেই করা হয়েছে ট্রাফিক পুলিশের আরেকটি স্হায়ী চৌকি। সেখানে স্হায়ী ট্রাফিক অফিস করতে এখন কাজ চলছে। নগরীর ব্যস্ততম এলাকায় পথচারীদের জন্য একটুও ফুটপাত উন্মুক্ত নেই।
নগরীর নিউমার্কেটের সামনের ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি রিয়াজুল ইসলাম নামের এক দোকানি ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন। রিয়াজুল ও তার ভাই রিংকু সেখানে ফুটপাত দখল করে গড়ে তুলেছেন স্যান্ডেলের দোকান। এলাকার আরো কয়েক যুবক তাদের দোকান তুলে দিয়ে নিজেরা দোকান দিতে চেয়েছিলেন। এ জন্য অনেক মানুষের সামনেই প্রকাশ্যে দোকানে গিয়ে রিয়াজুল ও রিংকুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এতে রিয়াজুলের মৃত্যু হয়।
এদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফুটপাতের অবৈধ দখলদার থেকে প্রতি মাসে এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও পুলিশের লোকজন আদায় করছে কোটি টাকার চাঁদা। ফুটপাতের এসব ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে তিন থেকে পাঁচ এবং কোথাও কোথাও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীরা জানান। তবে নগরীর কিছু এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে মাঝেমধ্যে অভিযান চালায় রাসিক ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাতে লাভ খুব একটা হয় না। উচ্ছেদের পরই আবার অবৈধ দখলে চলে যায়। ফুটপাত দখল ও খুনোখুনির বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিন ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত করে বিদেশের মতো কিছু সড়ক ও মোড়ে সাপ্তাহিক ওপেন মার্কেট করা যায়।’ এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইমরানুল হক বলেন, ‘আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গেলে লোকজন বলে, আমরা নাকি গরিবের পেটে লাথি মারছি। আমরা গেলে তারা সরে যায়, চলে এলে আবার বসে যায়।’