ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের লাগাম টানা জরুরি

একটি জলাশয়ের নিকট বসিয়া একদল শিশু ঢিল ছুড়িয়া খেলা করিতেছিল। তাহাতে আহত-নিহত হইতেছিল ঐ জলাশয়ে বসবাসকারী শত শত ব্যাঙ। কোনো ব্যাঙের শরীরে ঢিল লাগিলে শিশুরা আরো অধিক উৎসাহী হইত ঢিল ছুড়িতে। অতঃপর জলাশয় হইতে একটি বুড়া ব্যাঙ উঠিয়া আসিয়া শিশুদের নিকট করজোড়ে বলিল—যাহা তোমাদের নিকট খেলা, তাহা আমাদের নিকট মৃত্যুর সমান। এই মারণখেলা বন্ধ করো।

গল্পটি ইশপের। ইহার সহিত সাদৃশ্য রহিয়াছে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনার। রেলওয়ে পুলিশ তদন্ত করিয়া দেখিয়াছে, চলন্ত ট্রেনে যত পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার ৮০ শতাংশই শিশু-কিশোরদের কাজ। তাহারা ইহার ভয়াবহতা বুঝিতে পারে না। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা লইয়া পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হইয়াছে। স্থানীয় পর্যায়েও সক্রিয় রহিয়াছেন উদ্যমী অনেকে; কিন্তু তাহার পরও ট্রেনে পাথর ছুড়িবার ঘটনা বন্ধ হইতেছে না। রেল কতৃ‌র্পক্ষ ইতিমধ্যে জানাইয়াছে যে, দেশের সুনির্দিষ্ট ৭০টি পয়েন্ট হইতে রেলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিতেছে। ইহার মধ্যে ৩০-৪০টি পয়েন্টে পাথর ছুড়িবার ঘটনা ঘটিতেছে অধিক হারে।

গত ২০১৯ সালে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে প্রায় ৫০০। গত বৎসরের জানুয়ারি হইতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে চলন্ত ট্রেনে অন্তত ১১০টি পাথর ছুড়িবার ঘটনা ঘটিয়াছে। এই সকল ঘটনায় আহত হইয়াছেন ২৯ জন যাত্রী, ট্রেনের জানালার কাচ ভাঙিয়াছে ১০৩টি। যেই সকল রুটে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিতেছে, সেইগুলির তালিকায় নূতন করিয়া যুক্ত হইয়াছে চট্টগ্রামের ষোলশহর-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রুট। এই রুটের দুই হইতে তিনটি পয়েন্টে পাথর ছুড়িবার ঘটনা ঘটিতেছে। শুধু এই এপ্রিলের প্রথম ১০ দিনেই কয়েকটি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯-১০ জন শিক্ষার্থী আহত হইয়াছেন। রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়াছে, যাহারা পাথর নিক্ষেপ করিতেছে তাহাদের অধিকাংশই মানসিক বিকৃত শিশু-কিশোর, টোকাই ও ভবঘুরে লোকজন। রেল কতৃ‌র্পক্ষ মূলত হিমশিম খায় যাহারা ঢিল ছুড়িতেছে, তাহাদের শনাক্ত করিতে। কারণ অধিকাংশ ঘটনা ঘটিয়া থাকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বা রাতের অন্ধকারে। ফলে মাঝেমধ্যে এই ধরনের পাথর নিক্ষেপকারীদের ধরা হইলেও তাহাদের সহজে আইনের আওতায় আনিয়া শাস্তি দেওয়া যাইতেছে না।

পৃথিবীর কোথাও ট্রেনে পাথর ছুড়িবার ঘটনা আমরা শুনিতে পাই না। আমাদের দেশে কেন এই প্রবণতা দেখা যায়? পাথর ছুড়িবার ফলে যাত্রীরাই শুধু আঘাতপ্রাপ্ত হইতেছে না, ইহার সহিত ক্ষতি হইতেছে ট্রেনের। প্রায় তিন বৎসর ধরিয়া পাথর নিক্ষেপের পয়েন্টগুলিতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোসহ নানাভাবে পাথর নিক্ষেপের গেট বন্ধের চেষ্টা করা হইতেছে; কিন্তু কিছুতেই তাহা বন্ধ করা যাইতেছে না। সমগ্র দেশে ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথ রহিয়াছে। রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর ছোড়া হইলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রহিয়াছে। তবে পাথর নিক্ষেপে কাহারো মৃত্যু হইলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডেরও বিধান রহিয়াছে। যদিও এই সকল আইনে এখন অবধি কাহারো শাস্তির নজির নাই। অন্যদিকে, রেলের বিস্তৃত এলাকার সকল স্থানে পুলিশের পাহারারও কোনো সুযোগ নাই। আর ট্রেনে ঢিল ছুড়িয়া মারিলে ট্রেনটি থামাইয়া দুষ্কৃতকে ধরাও সম্ভব নহে।

তাহা হইলে কী উপায়ে ইহার সমাধান সম্ভব? এই ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, রেল পুলিশের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখিবার ব্যবস্থা করা যাইতে পারে এবং যেই ৭০টি স্পটে পাথর ছুড়িবার ঘটনা অধিক ঘটে, সেই সকল স্পটে পূর্ব হইতেই অধিক সতর্ক থাকা যাইতে পারে। কেহ পাথর ছুড়িলে তাহাদের দিকে রেল পুলিশ শূন্যে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করিলে এই বার্তা যাইবে যে, পাথর ছুড়িলে গুলি খাইতে হইতে পারে। ইহার সহিত শাস্তির দৃষ্টান্তগুলি প্রচার করা দরকার, যাহাতে শাস্তির ও প্রাণের ভয়ে তাহারা নিরস্ত হইতে পারে এমন দুষ্কর্ম হইতে।