তৃতীয় বিশ্বের ঐক্য কেন প্রয়োজন

বিশ্বকে জ্ঞানী-গুণী ও বিদগ্ধজনেরা তিনভাবে বিভক্ত করিয়াছেন| প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্ব| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ওয়ারশ জোট গঠিত হয়| ন্যাটো সদস্যভুক্ত পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক দেশগুলিই হইল প্রথম বিশ্ব| পক্ষান্তরে ওয়ারশভুক্ত সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দেশগুলিকে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্ব|
আর কোনো পক্ষে অংশ না নেওয়া আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, ওশেনিয়ার দেশগুলি হইল তৃতীয় বিশ্ব| দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ফসল হইল এই বিশ্ববিভাজন| প্রকৃতপক্ষে উপরিউক্ত দুই ব্লকের শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত তৃতীয় বিশ্বের মানুষ|
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হইলেও নব্য উপনিবেশবাদের চিন্তাচেতনা হইতে এই বিভাজনের অস্তিত্ব বলিতে গেলে আজও রহিয়া গিয়াছে| অতীতেও দেখা গিয়াছে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের ব্যানারে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি ঐক্যবদ্ধ হইবার চেষ্টা করিয়াছে| সাউথ-সাউথ কো-অপারেশনের কথাও আমাদের অজানা নহে| কিন্তু এই ধরনের চেষ্টা সফল হয় নাই| সুহার্তো, টিটোর ন্যায় যাহারা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়াছিলেন, তাহাদের অনেককে শেষ পর্যন্ত জীবন দিতে হইয়াছে| তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ঐক্যবদ্ধ থাকিবার কথা আবারও বিশ্বে নানাভাবে উচ্চারিত হইতেছে| যদি এই সকল দেশ এক হইতে পারিত, তাহা হইলে কেহ তাহাদের উপর খবরদারি করিতে পারিত না|

করোনা মহামারির সময় আমরা লক্ষ করিয়াছি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি করোনার টিকা লইয়া একধরনের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল| তাহারা এই ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হইয়াছে| করোনা মহামারি লইয়া আশঙ্কা এখনো পুরাপুরি দূর হয় নাই| ইতিমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ আসিয়া তৃতীয় বিশ্বকে আবার অস্হির করিয়া তুলিয়াছে| দেশে দেশে বাড়িয়া গিয়াছে মূল্যস্ফীতি| বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত হইয়া পড়িয়াছে| দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অস্হিরতা আমরা লক্ষ করিতেছি|

ইহার সহিতও ইউক্রেন যুদ্ধের সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে| গরিব, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি আজ বিপাকে পড়িয়াছে| এই সকল দেশ উন্নত বিশ্বের কাঁচামাল সরবরাহকারী| তাহাদের কাঁচামাল পাকা করিয়া পরবর্তীকালে সেই সকল পণ্য ১০ গুণ পর্যন্ত অধিক মূল্যে বিক্রয় করা হয়| এই সকল দেশের সস্তা শ্রম ব্যবহার করিয়া প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বের ধনী দেশগুলি আরো ধনী হইতেছে| কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের ভাগ্যোন্নয়ন শীঘ্র হইতেছে না| তাহারা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রহিয়া গিয়াছে| এই সকল দেশের সংখ্যাই বেশি| তাহারা যদি একতার বন্ধনে আবদ্ধ হইত, তাহা হইলে মোড়ল দেশগুলির জারিজুরি বন্ধ হইয়া যাইত|

নব্বইয়ের দশকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় দেশ যখন তাহার প্রতিবেশী ছোট্ট একটি দেশকে দখল করিয়া লয়, তখন বড় শক্তির দেশের এই অন্যায় আক্রমণ পৃথিবীর অন্যান্য ছোট দেশের জন্যও অস্বস্তির কারণ ছিল| এই ধরনের ঘটনাগুলি একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি কেবল আক্রমণ নহে, তাহা পায়ে পাড়া দিয়া যুদ্ধের শামিল| পৃথিবীতে মোড়লের সংখ্যা হাতেগোনা| তাহারা ছোট দেশগুলি লইয়া নিষ্ঠুর খেলা খেলিতেছে অনেক দিন ধরিয়া| তবে যত দুর্বল মনে করা হয়, আসলে এই সকল দেশ তত দুর্বল নহে|

এই সকল দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, জনশক্তিতে অগ্রসরমাণ| কিন্তু কোনোটারই তাহারা সদ্ব্যবহার করিতে পারিতেছে না| তৃতীয় বিশ্বের দাবিদাওয়ার সপক্ষে একদা জার্মান চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হইয়াছিল| এই সময় ফিলিপিন্স ও ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্টসহ অনেকে উচ্চকণ্ঠিত হন| তাহারা তেলের নাঘ্যমূল্যসহ তাহাদের দেশে গড়িয়া তোলা সেই দেশের সামরিক স্থাপনার জন্য ভাড়া দাবি করেন| আর যায় কোথায়? ইহার পর তাহাদের সরকার পরিবর্তনে অধিক সময় লাগে নাই| তাহার পরও তৃতীয় বিশ্বের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য| সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের দেশ হইতে বাহির করিয়া দিবার হুমকি দিয়াছিলেন| এখন সেই দেশটিতে কাজের লোকের অভাব দেখা দিতেছে| কেননা নূতন অভিবাসীরা যেই কাজ করিতেন, তাহা স্থানীয় আমেরিকানরা করিতে চাহেন না|

অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্ব যদি এক হয় এবং উপরিউক্ত দুই বিশ্বের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন গড়িয়া তোলে, তাহা হইলে উন্নত দেশের মানুষ দুই দিনও চলিতে পারিবে না| কিন্তু সবচাইতে দামি প্রশ্ন হইল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে? কে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে জীবনের ঝুঁকি লইয়া ঐক্যবদ্ধ করিবেন?