বেইজিংয়ের কাছের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের নীতি নিয়ে বেশ কিছুটা চিন্তিত ছিল হোয়াইট হাউজ। কারণ, গত পাঁচ বছর ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির প্রেসিডেন্ট সব সময়ই উত্তর কোরিয়া ও চায়নার সঙ্গে একটা মিত্রতা গড়ার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি এশিয়াতে আমেরিকার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক বন্ধু জাপানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া গত পাঁচ বছর তাদের অতীত ইতিহাস টেনে বেশ কিছু কাজ করে—যাতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সেনাবাহিনী সে দেশের নারীর ওপর যে অত্যাচার করে, তার বিরুদ্ধে কোরিয়া কোর্টের রায় ও জাপানের কোম্পানিতে কোরিয়ান শ্রমিকদের ওপর অবিচারের কারণে জাপানি কোম্পানির সম্পত্তি ক্রোক—এসব মিলিয়ে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। যার প্রভাব পড়ছিল আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতেও। এবং অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল চীন। যে কারণে এবারের দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচনের বেশ আগের থেকে আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ সেটাকে যথেষ্ট মনিটর করে। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দক্ষিণ কোরিয়া সফরও করেন। আর শেষ অবধি খুব কম মার্জিনে হলেও লিবারেল পার্টির নেতা মুনের পরাজয় ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ইয়ুন সুক ইয়লের বিজয়ে একটু হলেও ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে হোয়াইট হাউজের অনেকের।
তার পরও আমেরিকা লক্ষ্য করছিল, আসলে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি তাদের পছন্দের পথে অগ্রসর হয় কি না? শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট যখন আকার ইঙ্গিতে বলে দিলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উত্তেজনা সৃষ্টিও তাকে সহায়তা করছে, যারা তাদেরকে দক্ষিণ কোরিয়া বন্ধু মনে করে না। এ কথা নিঃসন্দেহে সন্তুষ্টির কারণ ছিল হোয়াইট হাউজের। বিজয়ী প্রেসিডেন্ট ইয়ল এখনো ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। আগামী ১০ মে তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। কিন্তু এর মধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় পরির্বতনের ইঙ্গিত পৌঁছে গেছে। যার ভেতর দিয়ে প্রথম যে তথ্যটি মিলেছে সেটা শুধু এশিয়ার রাজনীতিতে নয়, বিশ্বরাজনীতিতেও অনেক বড় ঘটনা। ১৪ এপ্রিল সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা কয়েকটি মিডিয়াকে জানিয়েছে, আগামী ‘কোয়াডের’ মিটিং-এ তার দেশ অবজারভার হিসেবে উপস্হিতি থাকছে। সংক্ষেপে যা ‘কোয়াড’ বলে ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়ে গেছে এই ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট ‘কোয়াডেলেটরাল সিকিউরিটি ডায়ালগ’-এ এখন সক্রিয় সদস্য আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ কোরিয়াই প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ও বেইজিংয়ের খুব কাছের দেশ হিসেবে ঐ কোয়াডের মিটিংয়ে অবজারভার হিসেবে থাকছে। আগামী ২৪ মে কোয়াডের মিটিং জাপানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে তারা যোগ দেবে। দক্ষিণ কোরিয়া এভাবে কোয়াডে যাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় আমেরিকা কোয়াডকে বেইজিংয়ের নাকের ডগায় নিয়ে যেতে সমর্থ হলো।
অন্যদিকে ২৪ মে দক্ষিণ কোরিয়া কোয়াডে যোগ দেওয়ার আগে ১২-১৩ মে দুই দিনব্যাপী আসিয়ানের নেতারা (মিয়ানমার হয়তো বাদ পড়তে পারে) হোয়াইট হাউজে মিলিত হচ্ছেন বাইডেনের সঙ্গে। যদি মিয়ানমার বাদ পড়ে তাদের গণতান্ত্রিক শর্ত পূরণের অভাবে, তারপরে আসিয়ানের অন্য সদস্য অর্থাৎ ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনস, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ঐ হোয়াইট হাউজে দুই দিনব্যাপী বৈঠকে বাইডেনের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন, যেখানে ট্রাম্প আসিয়ানকে এক কথায় বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। এবং সেই আসিয়ানকে অনেকখানি কাছে নিয়ে গিয়েছিল চীন, ঐ আসিয়ানকে হোয়াইট হাউজে তুলে আনা নিঃসন্দেহে আমেরিকার বা বাইডেনের এশিয়া নীতিতে অনেক বড় সাফল্য। আসিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার সব থেকে পুরোনো জোট। ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট ব্যাংককে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার সময়ে এর পেছনে আমেরিকার যথেষ্ট সহযোগিতা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কারণে আসিয়ানে চীন বেশ আধিপত্য নিয়ে নেয়। বাইডেন আবার সেটা তুলে আনলেন হোয়াইট হাউজে।
হোয়াইট হাউজে আসিয়ানের এই ধরনের সম্মেলন বা বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও জাপান আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে কোয়াডে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা গত দুই বছর ধরে অব্যাহত রেখেছে। যে কাজ মূলত জাপান শুধু তার জন্য নয় এশিয়ায় আমেরিকান নেতৃত্বাধীন জোটের আধিপত্য বৃদ্ধি এবং চায়নাকে কোণঠাসা করার জন্য করে চলেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা তার শেষ মেয়াদের শেষ সময়ে ভিয়েতনাম সফর করেছিলেন। এবং ভিয়েতনামকে সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার একটি চুক্তিও তিনি করেছিলেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি বদলে যাওয়ায় বিষয়টি খুব বেশি দূর এগোয়নি। এবার বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করার পরেই প্রথম সফর করেন ভিয়েতনাম। সেখানে তিনি ভিয়েতনামকে আহ্বান জানিয়ে এসেছিলেন, শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, সামরিক সহযোগিতায়ও ভিয়েতনাম ও জাপানকে এক হতে হবে। এবং বৃহত্তর সামরিক সহযোগিতার অংশীদার হতে হবে তাদেরকে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ঐ সফরের পর পরই বাইডেনও তার এক ভাষণে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলিকে সাউথ চায়না সি-এ তাদের ন্যাঘ্য অধিকার যাতে কেউ কেড়ে না নেয় সেজন্য এক হতে বলেন। বাস্তবে সাউথ চায়না সি-র পাশের দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ চীন তাদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে সাউথ চায়না সি-র তলদেশের তেল গ্যাসসহ সব ধরনের সম্পদ থেকে। অন্যদিকে চীনও মনে করে সাউথ চায়না সি-তে তার একক অধিকার। চীনের এই নীতির বিপরীতেই ঐ দেশগুলোকে নিজস্ব বলয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে আমেরিকা নিজে এবং জাপানের মাধ্যমে।
এছাড়া গত সপ্তাহে জাপানের সঙ্গে ফিলিপাইনসের টু প্লাস টু বৈঠক হয়েছে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি নিয়ে বৈঠক। ফিলিপাইনস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই জাপানবিরোধী মানসিকতা নিয়ে চলছে। কিন্তু এখন তারা বর্তমান বাস্তবতায় সেটাকে মিটিয়ে নিতে চায়। ইতিহাসের নতুন পাতার দিকে তারা একসঙ্গে এগোতে চায়। এই টু প্লাস টু বৈঠকে জাপান ও ফিলিপাইনস যদিও ডিফেন্সের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে পারেনি, তারপরে এটা স্পষ্ট হয়েছে, ফিলিপাইনস এই বলয়ে অর্থাৎ জাপান ও আমেরিকার বলয়ে আসতে আগ্রহী। ফিলিপাইনসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে। ঐ নির্বাচনে যেই জিতুক না কেন, তাতে তাদের এই পররাষ্ট্র ও ডিফেন্স নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। তাছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশীয় রাজনৈতিক গবেষক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার পরেই প্রথমে যে কোনো ফরমাটে হোক না কেন, ফিলিপাইনসই হবে পরবর্তী দেশ যে কোয়াডে যোগ দেবে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় দেশ ও বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দেশ ইন্দোনেশিয়া। সেখানে ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৩ হাজার লোকের ওপর একটা মতামত জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায়, অর্ধেক লোক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ মনে করে আগামী ১০ বছরের মধ্যে চীন তাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে ৪৩ শতাংশ লোক মনে করে, আমেরিকাও একই ধরনের হুমকি হতে পারে। এবং চায়না ও আমেরিকার বর্তমান যে সংঘাত এখানে ৮০ শতাংশ লোকই চায় তাদের দেশ নিরপেক্ষ থাকুক। তবে এই নিরপেক্ষ থাকার অবস্থানের পরেও জনমত জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ইন্দোনেশীয় মনে করেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমেরিকার থেকে চায়না তাদের জন্য অনেক বড় হুমকি। এবং এই হুমকি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য তাদের অন্য কোনো বড় শক্তির সঙ্গে যোগ দেয়া উচিত। এখন থেকে ১০ বছর আগেও ইন্দোনেশিয়ার ৫০ শতাংশের ওপরে লোক মনে করত, চায়নার অর্থনৈতিক উন্নতি ইন্দোনেশিয়ার জনে ভালো; কিন্তু এখন সেটা নেমে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া তাদের বেশি ভাগ লোক মনে করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমেরিকা অনেক ভালো পার্টনার চীনের থেকে।
দক্ষিণ এশীয় দেশ ভারত এখন সম্পূর্ণ ও সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক বন্ধুত্ব করছে। আবার পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা যেখানে চলে গেছে সেখান থেকে ভালো অবস্থানে আনার জন্য বর্তমান সরকারকে অবশ্য মালটি ন্যাশনাল অর্থনৈতিক অর্গানাইজেশানগুলোর সহায়তা নিতে হবে। আর এই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ এমনকি এডিবির সহায়তার জন্য আমেরিকা সহায়ক হলে সব সময়ই সুবিধা হয়। এজন্য তারা সব দিক থেকে আমেরিকার পক্ষেই যাওয়ার চেষ্টা করবে। শ্রীলঙ্কারও অর্থনীতি বাঁচাতে হলে পাকিস্তানের পথ নেওয়া অর্থাৎ আমেরিকার সহায়তায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির সহযোগিতা নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো আফগানিস্তানকেও তার অর্থনীতি—বিশেষ করে বর্তমানে যে খাদ্যভাব চলছে এখান থেকে বের হতে হলে পশ্চিমা সাহাঘ্য ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। পৃথিবীর মানবিক সংগঠনগুলো আমেরিকাসহ পশ্চিমাদেশগুলোকে আফগানিস্তানে সে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য বলছে। আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়ে, অনেক বেশি মানবধিকার ও নাগরিক অধিকার ও নারী স্বাধীনতা দিয়ে ওই সাহাঘ্য নেওয়া ছাড়া তাদেরও বাঁচার পথও নেই। এ কারণে তাদেরকেও দ্রুত আমেরিকার শরণাপন্ন হতে হবে।
তাই এখন বিষয়টি বেশ স্পষ্ট, এশিয়ায় জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর এখন সরাসরি আমেরিকার পক্ষে। এর পাশাপাশি ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া নেপাল ও আফগানও একই পথ ধরতে যাচ্ছে। আবার আশিয়ান নেতারা বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন হোয়াইট হাউজে। তাই রাজনীতির হিসাব নিকাশে আমেরিকা ও বাইডেন প্রশাসন বাস্তবেই তার বন্ধু বাড়িয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে এশিয়াতে। এর বিপরীতে চীন বন্ধু হারিয়ে ক্রমেই কোণঠাসা হচ্ছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক