মানুষ যখন সভ্য হইয়া উঠে নাই, তখনো আধিপত্য বিস্তারের জন্য কাদা-ছোড়াছুড়ি করিয়াছে। প্রস্তর যুগ হইতে শুরু করিয়া আধুনিক এই তথাকথিত সভ্যসময় পর্যন্ত মানুষ লক্ষাধিক বড় বড় যুদ্ধ করিয়াছে। এই জন্য অনেক ইতিহাসবেত্তা বলিয়া থাকেন, মানবজাতির ইতিহাস মূলত যুদ্ধের ইতিহাস। সুতরাং প্রশ্ন যদি করা হয় যুদ্ধ কেন হয়—তাহার চাইতে বড় কথা হইল— যুদ্ধ বাদ দিলে মানবজাতির ইতিহাসের পাতা সাদা থাকিয়া যাইবে। কিন্তু সেই সাদা পাতা থাকিলেও আমাদের কোনো দুঃখ থাকিত না। সাদা পাতা ভরাইতে যুদ্ধের যে প্রতিযোগিতা এখনো দেখা যায়—তাহা আমাদের মনে এই প্রশ্ন তুলিয়া দেয় যে, আমরা তো সৃষ্টির সেরা জীব, আমাদের কি এমন নৃশংসতা মানায়? ইতিহাসের পাঠ লইলে আমরা দেখিতে পাই, দেশে দেশে স্বৈরাচার আসিয়াছে, তাহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রতিরোধ গড়িয়া উঠিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে তাহাদের পতন হইয়াছে, আবার কোথায় কোথায় তাহারা দশকের পর দশক ধরিয়া টিকিয়া থাকিয়াছে।
ইতিহাসে আমরা দেখিয়াছি— ক্ষমতার শিখরে পৌঁছাইয়া ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই ঘোষণা করিয়াছিলেন—‘আমিই রাষ্ট্র!’ অর্থাৎ প্রবল ক্ষমতাধর রাজা যাহা বলিবেন, তাহাই শেষ কথা, তাহাই আইন। ‘ওয়ার্ল্ড বিয়ন্ড ওয়ার’ সংস্হা হইতে জানা যায়, ৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব হইতে ২০০০ খ্িরষ্টাব্দের মধ্যে সহস্রাধিক প্রধান প্রধান যুদ্ধ সংঘটিত হইবার ইতিহাস নথিভুক্ত হইয়াছে। বিংশ শতাব্দীতে আনুমানিক ১৬৫টি যুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়াছে। দুঃখজনকভাবে বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতের ৭৫ শতাংশই হলেন বেসামরিক নাগরিক—যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও দরিদ্র মানুষ। গত শতাব্দী হইতে ২০১৪ সাল অবধি বিশ্বের পরাশক্তিরা মিলিয়া আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, বসনিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গ্রেনাডা, হাইতি, ইরান, ইরাক, কসোভো, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, নিকারাগুয়া, পাকিস্তান, পানামা, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, ইউক্রেন, ইয়েমেন, সাবেক যুগোস্লাভিয়া এবং সম্প্রতি ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়ে নির্মম যুদ্ধাবস্হা তৈরি করিয়াছে। চলতি সময়ে চলমান একটি যুদ্ধে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই মৃতু্য হইয়াছে ৯ শতাধিক বেসামরিক মানুষের। আহত হইয়াছে আরো প্রায় দেড় হাজার মানুষ।
ক্ষমতা মদমত্তে মানুষের মনস্তত্ত্ব জটিল হইয়া যায়। এই জন্য বলা হয়—যুদ্ধ মূলত আয়োজিত হয় মানুষের মনে। এই মুহূর্তে বিশ্ব জনমতের তোয়াক্কা না করিয়া যেইভাবে একটি দেশে নিরপরাধ নারী-শিশুসহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হইতেছে—তাহা মানবসভ্যতার জন্য লজ্জাজনক। আমরা তো এখন আর আদিমযুগে বসবাস করিতেছি না, কিন্তু আমাদের কার্যকলাপ যেন আদিম যুগের চাইতেও লজ্জাজনক। বিশ্বব্যাপী এত নিন্দা, ঘৃণাও যুদ্ধবাজদের বিবেককে জাগাইতেই পারে না। যুদ্ধ যত বেশি দীর্ঘায়িত হয়, ততই আরো নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরিয়া থাকে। স্বৈরাচারীরা ‘মানবাধিকার হরণকারী’ হইয়া থাকে, তাহারা যুদ্ধের রক্তপাতকে দীর্ঘ সময়ের দিকে টানিয়া লইতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। তাহাদের হূদয় সিমারের মতো নিষ্ঠুর। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রমে হামলা চালাইতে তাহাদের হূদয় কাঁপে না। শিশুদের দেশহীন করিতে, শরণার্থী করিতে তাহারা লজ্জিত হন না।
সুতরাং ইতিহাসের পাঠ হইতে আমরা ইহা স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারি—এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। ইতিহাসের নিকট কোনো অপরাধের ক্ষমা নাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল—স্বৈরাচারীরা ইতিহাসের নিকট হইতে কোনো পাঠ গ্রহণ করেন না। যুদ্ধাপরাধের মধ্যেই যেন তাহাদের সুখ নিহিত।
আমরা আবার প্রশ্ন তুলিতে পারি—অসভ্য হইতে সভ্য হওয়া পর্যন্ত মানবজাতি প্রতিটি মানুষের জীবনরক্ষা তথা উপকার করিবার জন্যই তো অধিক মনোযোগী হইতে পারিত। উপকারের পরিবর্তে কেন মানুষ নিজেদের ক্ষমতা দেখাইতে এত অধিক অস্থির? অথচ অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে সবচাইতে বড় পাপ বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। ইতিহাসের নিকট কোনো অপরাধের ক্ষমা নাই।