বিদায় মাহে রমজান

আল্লাহ ছুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনুল করিমে ঘোষণা করেন যে, যদি লোকালয়ের লোকেরা ইমান গ্রহণ করে, আর তাক্বওয়া অবলম্বন করে, তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের সকল বরকতের দরজাসমূহ খুলে দেব (সুরায়ে আল আরাফ)। আর সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাক্বওয়া এজন্য অর্জিত হয় যে, এর মাধ্যমে মানুষের আত্মজ্ঞান তার দেহ এবং অন্যান্য শক্তিকে পরিপূর্ণরূপে আয়ত্তাধীন করে নিতে পারে। এর মাধ্যমে মনের যাবতীয় কামনা, বাসনা ও আবেগ-উচ্ছ্বাসকে নিজের সিদ্ধান্তের অনুসারী করে তুলতে পারে। এভাবেই তৈরি হয় আত্মসংযম।

ইসলামের দৃষ্টিতে সফল জীবনের জন্য অনুগত খুদি একান্ত অপরিহার্য। যে খুদি অবাধ্য তার অন্যতম উদাহরণ হলো—ফিরাউন, নমরুদ, হাম্মান, কারুণ, আবু জেহেল প্রমুখ। যারা পৃথিবীতে শুধু অশান্তি এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। সুতরাং পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন ইসলাম ধর্ম এবং ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভকে অনুসরণ ও অনুকরণ করা।

মাহে রমজানের রোজার পিলার বা স্তম্ভটি মানুষের মধ্যে অনুগত খুদি তৈরি করে। নফছ ও দেহের যাবতীয় চাহিদা যাচাই-বাছাই করে দেখলে জীবন ও দেহের দাবি খুবই জরুরি বলে মনে হয়। জীবন ও দেহের তিনটা দাবি—এক. ক্ষুন্নিবৃত্তি জীবন রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক। দুই. যৌন আবেগ তথা মানবজাতির বংশ বিস্তার স্থিতির জন্য যা প্রয়োজন। তিন. বিশ্রাম গ্রহণ দরকার। মানুষের এ তিনটি দাবি যদি নিজ নিজ পরিসীমার মধ্যে থাকে, তাহলে তা বিশ্বপ্রকৃতির অন্তর্নিহিত ভাবধারার অনুরূপ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে নফছ ও দেহের কাছে এ জিনিস হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফাঁদ। নফছ এবং দেহ উক্ত ফাঁদের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। একটু ঢিলা একটু সুযোগ পেলেই এ তিনটি ফাঁদ মানুষের খুদিকে বন্দি করে নিজের গোলাম, নিজের দাসানুদাস বানিয়ে দেয়। ফলে প্রত্যেকটি দাবি সম্প্রসারিত হয়ে অসংখ্য অগণিত দাবির একটি দীর্ঘ ফিরিস্তি হয়ে যায়। একটি দুর্বল খুদি এ সব দাবির নিকট পরাজিত হয়। তখন খাদ্যের দাবি তাকে পেটের দাস বানিয়ে দেয়। যৌনক্ষুধা অনেক নিম্নস্তরে নামিয়ে ফেলে। বিশ্রামপ্রিয়তা তার ইচ্ছা শক্তিকে বিলোপ করে দেয়। অতঃপর সে তার নফছ ও দেহের শাসক, পরিচালক বা বাদশাহ বনে যায়। সে তার দাসে পরিণত হয়। আর মাহে রমজানের রোজা নফছের এই কামনা বাসনা এবং লালসাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। নিয়মানুগ করে ৭২০ ঘণ্টার এই বাধ্যতামূলক সুমহান প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে।

সে যদি একমাত্র মহান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে, এ রোজা তাকে সম্বোধন করে বলে আল্লাহপাক আজ সারা দিন পানাহার করাকে নিষেধ করেছেন, অনুগত খুদি তা মেনে নেয় অকাতরে। রোজা আহ্বান জানায় আজ তোমার মালিক আল্লাহ তোমার যৌনক্ষুধা চাহিদার ওপরে দিনের বেলা বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। অনুগত খুদি তা শির নত করে মেনে নেয়।

সারা দিন দুঃসহ ক্ষুধা-পিপাসার পর ইফতার করবে, তখন পরিশ্রান্ত হয়ে আরাম আয়েশ করার পরিবর্তে কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ নামাজ পড়ার জন্য তৈরি হও এবং অন্যান্য দিনের চেয়েও বেশি বেশি করে ইবাদত কর। বস্তুত এতেই তোমার রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি নিহিত আছে। এর ফলে খুদির মধ্যে একটি বিরাট শক্তি সঞ্চারিত হয়, স্ফুরিত হয়। এবং তা আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী নিজের নফছ এবং দেহের শাসনক্ষমতা চালাতে সক্ষম হয়।

মুমিন বান্দার আত্মজ্ঞান তার ক্ষুধা পিপাসা, যৌনবৃত্তি এবং বিশ্রাম অভিলাষ শুধু রোজার মাসেই সীমাবদ্ধ নয় বরং পরবর্তী এগারো মাস ধরে ও মানুষের তিনটি সর্বপ্রধান এবং সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী শানিত হাতিয়ারের মোকাবিলা করে একমাত্র মহান আল্লাহর বিধানের অধীনে তার জীবনযাত্রার সকল রুটিনসমূহকে অনুগত করে দেয় । আর এজন্য তাক্বওয়া সৃষ্টিতে মাহে রমজানের রোজা অত্যন্ত নিয়ামকের অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

লেখক: অতিথি অনুবাদক, মক্কা আল মুকাররামাহ ও সাবেক খতিব, জাতীয় সংসদ জামে মসজিদ।