ফ্রান্স একসময় আমাদের নিকট অতি পরিচিত ছিল সুগন্ধির দেশ হিসাবে। না, ভুল হইল। শুধু ফরাসি সৌরভ নহে, ঔপনিবেশিক যুগে ভারতে ছিল ফরাসিদের জোরালো পদচারণা। পলাশির যুদ্ধে তাহারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পক্ষাবলম্বন করিয়াছিল।
সেই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পাশাপাশি ভারতে শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, অতঃপর ব্রিটিশ শাসন। আর ফরাসিরাও তাহাদের ভারতসংশ্রব ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়; কিন্তু বর্তমান বিশ্ব একটি গ্রামের মতো। এক দেশের স্থিতিশীলতা, অস্থিরতা আরেক দেশকে স্পর্শ করিয়া যায়। সেই অর্থে ফ্রান্সের নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের নিকট গুরুত্ব বহন করে বইকি। ফ্রান্সে ১০ এপ্রিল প্রথম রাউন্ড এবং ২৪ এপ্রিল দ্বিতীয় রাউন্ড প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইল। এই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় লাভ করিয়াছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল জ্যাঁ মিশেল ফ্রেডেরিক ম্যাক্রঁ, যিনি ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ নামেই বিশ্বব্যাপী পরিচিত। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসাবে তিনি পাঁচ বত্সর দায়িত্ব পালন করিবেন।
প্রথমেই তাহাকে আমাদের পক্ষ হইতে অভিনন্দন। উল্লেখ্য, ফ্রান্সের সংবিধান অনুসারে প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার পরিচালনার পদ্ধতিকে বলা হইয়া থাকে ফিফথ রিপাবলিক বা পঞ্চম প্রজাতন্ত্র। ১৯৫৮ সালে ফোর্থ রিপাবলিক বিলুপ্তির মাধ্যমে পঞ্চম রিপাবলিক চালু হয়। এই পার্লামেন্টারি ফোর্থ রিপাবলিক ছিল আধা রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান থাকিতেন; কিন্তু ফিফথ রিপাবলিকের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে বলিতে সর্বেসর্বা করিয়া তোলা হয়। সেই অর্থে আগামী পাঁচ বৎসর ফ্রান্সের ভালোমন্দ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—সকল কিছুর দায় বহন করিতে হইবে ইমানুয়েল ম্যাক্রঁকেই।
ম্যাক্রঁ এমন একটি সময়ে দ্বিতীয় বারের মতো ফ্রান্সের দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন, যখন ইউরোপ রীতিমতো একটি যুদ্ধের মধ্যে রহিয়াছে। সরাসরি সৈন্যবাহিনী ব্যবহার না হইলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতোই জড়াইয়া রহিয়াছে। বরং বড় দেশ হিসাবে ফ্রান্সের স্বার্থ আরো বেশি ঘনিষ্ঠ। এই যুদ্ধের কারণে ইউরোপব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়িয়াছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে গত ৪০ বৎসরের মধ্যে সর্বাধিক। প্যানডেমিক ও যুদ্ধের কারণে ফরাসি সমাজেও চলিতেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা। এমনই সময়ের নির্বাচনে ফরাসি জনগণ আবারও ম্যাক্রঁর উপর ভরসা রাখিয়াছে, ইহা চাট্টিখানি কথা নহে।
এই নির্বাচনে ম্যাক্রঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লি পেন ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন, জীবনযাত্রা সাবলীল করিতে আয়কর কর্তন করা হইবে, মুসলমানদের নেকাব পরিধান নিষিদ্ধ করা হইবে এবং অভিবাসন প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করা হইবে; কিন্তু ফরাসি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাহার এই প্রতিশ্রুতির প্রতি কোনো আকর্ষণ দেখায় নাই। অপরদিকে ৫৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ ভোট পাইয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়া আইফেল টাওয়ারের নিচে উল্লসিত জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়া ম্যাক্রঁ বলিয়াছেন, নির্বাচন চলিয়া গিয়াছে (ইলেকশন ইজ ওভার), এখন আমি সকল ফরাসির প্রেসিডেন্ট। ইহাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
এই নির্বাচনের একটি বিশেষ তাৎপর্য হইল, ইউরাপের এই চরম সংকটকালে মধ্যপম্হি ম্যাক্রঁকে জিতাইয়া দিয়া ফরাসিরা প্রমাণ করিয়াছেন, তাহারা এখন আর উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন না। আমরা আশা করিব, ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ ইউরোপ তথা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আগামী পাঁচ বত্সর ফরাসিদের পক্ষ হইতে সফল প্রতিনিধিত্ব করিবেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা, নিরীহ মানুষের জীবন নাশ বন্ধ করিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করিবেন। সর্বোপরি বিশ্বনেতৃবৃন্দের সহিত মিলিয়া বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে বিশেষ অবদান রাখিবেন। পুনরায় নির্বাচিত হওয়ায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁকে আরো একবার আমাদের আন্তরিক অভিবাদন।