পৃথিবী জুড়ে বিরাজমান যুদ্ধবিগ্রহ, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈরাজ্যসহ এমন নানাবিধ কারণে চরম অব্যবস্হাপনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে খাদ্যোত্পাদন, বণ্টন ও বিনিময় প্রক্রিয়া। বিশ্ববাজারে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রব্যমূল্য এবং সেই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিতে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত শুল্ক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট সংকট আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারকে রীতিমতো অস্হিতিশীল করে রেখেছে।
দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বী অবস্হান দরিদ্রদের পাশাপাশি ধনীদেরও অনাহার আর অর্ধাহারে ভোগাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে উভয় দেশের আমদানি-রপ্তানিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ চলছে। ফলে খাদ্য আমদানির জন্য এই দুই দেশের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো পড়েছে চরম বিপাকে। ইন্দোনেশিয়া তাদের রপ্তানি কার্যক্রম কিছুটা কমিয়ে এনে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। আর্জেন্টিনা তাদের রপ্তানি শুল্ক আগের চেয়ে বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে তত্সংশ্লিষ্ট আমদানিনির্ভর দেশগুলোর খরচ অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। এভাবে প্রথম বিশ্ব ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে খাদ্য আমদানি-রপ্তানিতে সৃষ্ট অব্যবস্হাপনা সম্পূর্ণ বিশ্ববাজারকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। এই গণ্ডির বাইরে নয় বাংলাদেশও, যেখানে আন্তর্জাতিক সংকট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই)-এর তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে গম, ভোজ্য তেল, সার ও ভুট্টা জাতীয় পণ্যের উত্পাদন ও বিনিময়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য চাল তথা ভাত হলেও, দ্বিতীয় অবস্হানে রয়েছে গম। গমের বার্ষিক মোট চাহিদার মাত্র এক-চতুর্থাংশ উত্পাদন করতে পারে বাংলাদেশ। গমের অবশিষ্ট চাহিদা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করার মাধ্যমে মেটানো হয়। গম উত্পাদনের ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্হানে থাকা রাশিয়া ও ইউক্রেন তাদের যুদ্ধ পরিস্হিতির কারণে উত্পাদন ও বণ্টন পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। যার ফলে বাংলাদেশ গম আমদানির ক্ষেত্রে চরম সংকট মোকাবিলা করতে যাচ্ছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল গ্র্যাইন কাউন্সিল (আইজিসি)-এর প্রতিবেদনে বলা হয় বর্তমান অর্থবছরে ভারতের উদ্বৃত্ত গমের পরিমাণ হবে প্রায় ২৪ মিলিয়ন টন। এক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশ তার গমের চাহিদা মেটাতে ভারতের কাছ থেকে কিছুটা সুবিধা নিতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বৃহৎ পরিসরে পাম তেল, রেপসিড ও সয়াবিন আমদানি করে থাকে। ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল এবং আর্জেন্টিনা থেকে রেপসিড আমদানি করে বাংলাদেশে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বর্তমানে সম্ভাব্য বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের বিষয়কে বিবেচনায় রেখে ইন্দোনেশিয়া, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। আর্জেন্টিনা সম্প্রতি তাদের রপ্তানি শুল্ক কিছুটা বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে তৈলবীজ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশেকে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে নতুন উত্সের সন্ধান করতে হচ্ছে বাংলাদেশের। ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার তৈরি ‘নর্ড স্ট্রিম-২’ পাইপলাইন বন্ধ থাকার ফলে ইউরোপের তীব্র জ্বালানিসংকট নিরসনে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর চাপ অনেকটা বেড়েছে। এমন চাপের মুখে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশও কিছুটা বিপাকে পড়েছে বলে মনে করা হয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে চাষাবাদের অন্যতম অংশীদার সার, যার বৃহত্ অংশের জোগান দেওয়া হয় আমদানির মাধ্যমে। বিশ্ববাজারে সার রপ্তানিতে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শীর্ষ স্হান দখল করে আছে রাশিয়া। এক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি, যার প্রভাব সরাসরি প্রান্তিক কৃষিতে গিয়ে পড়ছে।
উপমহাদেশে ১৯৪৩-এ ১৯৭৪ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়, যার প্রধান কারণ ছিল অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, যুদ্ধ পরিস্হিতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। এমন পরিস্হিতিতে তীব্র খাদ্যসংকট তৈরি হওয়া এবং দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়াটা মোটামুটি স্বাভাবিকই বলা যায়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো অসংগতি না থাকা সত্ত্বেও পণ্যের বাজার অনেকটা অস্হিতিশীল। এর অন্যতম কারণ বলা যায় সিন্ডিকেট সদস্যদের দৌরাত্ম্য, যারা জোট বেঁধে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে। প্রান্তিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা পণ্যের গুদামজাত করে প্রতিনিয়ত লাভবান হচ্ছে। নোবেল পুরস্কারে ভূষিত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার, ‘দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ’ বইতে উল্লেখ করেছেন কীভাবে উদ্বৃত্ত উত্পাদন থাকা সত্ত্বেও মানুষ না খেয়ে মরতে পারে। এর বাস্তবচিত্র সিন্ডিকেটের তৈরি কৃত্রিম সংকট।
বেকারত্ব, চরম দরিদ্রতা, অপর্যাপ্ত আবাদি জমি, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যসংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্হা (এফএও) এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের। গ্লোবাল হাঙ্গার ইন্ডেক্সের তথ্য মতে বাংলাদেশ সম্ভাব্য খাদ্যসংকট পরিস্হিতিকে অধিক গুরুত্বসহকারে দেখছে। বাংলাদেশে যে হাঙ্গার প্রকল্প চলমান রয়েছে তা মূলত স্হানীয় ও জাতীয় এই দুই পরিসরে কাজ করে যাচ্ছে। নগর বনায়ন, ন্যাঘ্য বাজার ব্যবস্হাপনা, মত্স্য আহরণ—এই তিন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্ভাব্য খাদ্যসংকট পরিস্হিতি মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষ্যমতে, কোনোভাবেই খাদ্যসংকট পরিস্হিতির মুখোমুখি হওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহণ করে একই জমিতে একাধিক ফসল উত্পাদন করতে হবে। পতিত জমিকেও ব্যবহারোপযোগী করে নিতে হবে, যাতে অতিরিক্ত ফসল উত্পাদন করা যায়। সর্বোপরি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতায় আমরা সম্ভাব্য বৈশ্বিক খাদ্যসংকট পরিস্হিতি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করব এবং খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
হ লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়