দাগাল: শুধু উপন্যাস নয়, যেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি

এই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কথা সাহিত্যিক হাসান হামিদের উপন্যাস দাগাল। উপন্যাসটির পাতায় পাতায় লেখক নিপুণ মমতায় মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোর ছবি এঁকেছেন। বাঙ্গালি জাতিসত্তার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ এক অনিবার্য বাস্তবতা। নিরীহ-নিরস্ত্র একটি জাতির উপর অযাচিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া একটি যুদ্ধ জনজীবনে কী অবর্ণনীয় দুঃসময় ডেকে এনেছিল তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দেয় দাগাল। ঔপন্যাসিক হাসান হামিদ আরও তুলে ধরেছেন একটি অকুতোভয় জাতির চরম সময়ে চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে অনাগত প্রজন্মের জন্য একটি নতুন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবিরাম প্রচেষ্টা।

'দাগাল' একটি সোমালিয়ান শব্দ। যার অর্থ 'যুদ্ধ'। উপন্যাসটি শুরু হয় পিশাচ ইয়াহিয়া খানের ২৫ মার্চ ঢাকা ত্যাগের গঠনার মধ্য দিয়ে। ধোঁকাবাজদের ধোঁকাবাজি রক্তে মিশে যায়, তাই ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালি জাতিকে আলোচনার নামে ধোঁকা দিতে আরেক ধোঁকাবাজ জুলফিকার আলি ভুট্টোকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অস্ত্র ও সৈন্য সমাগম নিশ্চিত করে তিনি যখন পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন ভুট্টো তা জানতেই পারলেন না। অস্থির পড়ে রইলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ফোন করলেন বঙ্গবন্ধুকে। তার বোকামি শুনে বঙ্গবন্ধু তখন মুচকি হাসছিলেন। কারণ তিনি জানতেন আলোচনার আড়ালে সেনাশাসক ইয়াহিয়ার দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতা। বর্বর পাকিস্তানিদের অপারেশন সার্চলাইট ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা চালায় এদেশের শহরগুলোতে। বিশেষত, ঢাকা শহরে। নির্বিচারে প্রাণ দেন এদেশের নিরীহ ছাত্র-শ্রমিক-জনতা, সাহসী পুলিশ বাহিনী, ইপিআর সদস্য, ও তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা মাঠের রাজনীতিতে অগ্রগামী কর্মীরা।

ঔপন্যাসিক হাসান হামিদ বঙ্গবন্ধুর সেই সময়কার দিনগুলোর সাবলিল বর্ণনা দিয়েছেন। জনতার মাঝে অহোরাত্র কাটানো একজন মানুষকে জনবিচ্ছিন্ন করার পাকিস্তানি নীল নকশার নিরেট বিশ্লেষণ আমরা পাই দাগাল উপন্যাসে। দেশ ও জনগণের প্রতি একজন নেতার আবেগ, অনুভূতি ও দায়বদ্ধতার অনুপম উদাহরণ একজন শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের প্রশ্নে তার কাছে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন যেন কিছুই না।

চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে একজন নেতা যেভাবে অবিচল থাকতে পারেন তা হয়তো অনেকের কাছে আজ ফিকশন মনে হতে পারে। বিশেষ করে আজকের ভঙ্গুর পাকিস্তান আর সেই সময়ের শক্তিশালী পাকিস্তানের তফাৎ হয়তো অনেক তরুণদের দৃষ্টিগোচর নাও হতে পারে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে তৎকালীন বাস্তবতার অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ না থাকলে, অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নির্মোহ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল ২৫ মার্চ কি হতে যাচ্ছিল তা জেনেও আত্মগোপন না করা। এক্ষেত্রে তার আশংকা ছিল তাকে না পেলে তারা দেশটাকে তছনছ করে ছাড়বে। কিন্তু পাক হানাদাররা যুদ্ধের সকল রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২৫ মার্চ কালো রাতে চালিয়েছিলো ইতিহাসের নৃশংস গণহত্যা।

তবে ইতিহাস বলছে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপন না করে গ্রেফতার হয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির সম্মান সারা বিশ্বের কাছে আকাশস্পর্শী উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্ব অবাক চোখে তাকিয়েছিল নিজেকে বিপন্ন করে একজন নেতা কীভাবে শুধু দেশপ্রেম বুকে নিয়ে একটি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী চৌকশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। বস্তুত, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক বিজয় সেদিনই হয়ে গিয়েছিল। দাগাল লেখক মুক্তিযুদ্ধের এই বাস্তবতাকে পাঠকের সামনে সবাক চলচ্চিত্রের মত বিবৃত করেছেন।

দাগাল বলছে পাকিস্তানের নির্জন মিয়ানওয়ালি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর দিনলিপি। একজন জাতীয় নেতাকে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে সাধারণ বন্দীদের মতো রাখার চরম অসভ্যতা পাকিস্তানি স্বৈরশাসক দেখিয়েছিলেন। এমনকি, তাকে দৈনিক পত্রিকা পড়ার অধিকারও দেওয়া হয়নি। স্বাধীনচেতা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক মানুষটা যেন আজ নিঃসঙ্গ শেরপা। নিজের দেশ ছেড়ে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়েও প্রিজন সেলে স্বাধীন স্বদেশের স্বপ্নে বিভোর শেখ মুজিবুর রহমান। আত্মবিশ্বাসী মুজিব নিশ্চিত তার সন্তানেরা এদেশকে স্বাধীন করবেই। তার চেতনা প্রতিরোধের বহ্নি শিখা হয়ে পাক হানাদারদের তাড়িয়ে বেরাচ্ছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে।

উপন্যাস হতে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। "সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ইয়াহিয়া মুজিবের মৃত্যুদণ্ডাদেশে সই করেছেন, তাও মুজিবের অজানা। খবরের কাগজে যা প্রকাশিত হচ্ছে সে সম্পর্কেও মুজিব জানেন না। দীর্ঘদিন তিনি কারাগারে। তার চোখের সামনে নিয়তই দৃশ্যমান শুধু সেলের বিবর্ণ দেয়াল, ময়লা কম্বল, রুক্ষ কিছু চোখ আর একজোড়া ছেড়া স্যান্ডেল। যদিও গভীর চোখে তিনি স্বপ্ন লুকিয়ে রেখেছেন, আগলে রেখেছেন মুক্তির বিশ্বাস।"

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনায়ক তাজউদ্দীন আহমেদ। প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের আরেক উদাহরণ বঙ্গতাজ। দাগাল উপন্যাস জুড়ে রয়েছে কি ঘরে কি বাইরে দল, রাষ্ট্র ও সরকারকে দেশে বা প্রবাসে হাজারো ঝড়-ঝঞ্ঝা সামলে আগলে রেখে একটি নতুন জাতির অভ্যুদয়ে একজন তাজউদ্দীন আহমেদের ভূমিকা। মুজিবনগর সরকার গঠনের আগেই কীভাবে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধির সাথে একটি নবরাষ্ট্র গঠনের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনার পটভূমি তৈরী করেছেন তিনি। আন্তঃদলীয় দ্বন্দ্বে কোণঠাসা থেকেও অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী নির্ভীক থেকেছিলেন। দাগাল লেখক আমাদের জানাচ্ছেন দলীয় কোন্দল এবং স্যাবোটেজ ঝুঁকি মাথায় নিয়েও বঙ্গবন্ধুও তার পরিবারের প্রতি তাজউদ্দীনের কমিটমেন্টের এতটুকু কমতি ছিল না। জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধে বেসামরিক নেতৃত্বের যে ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিল তার বাতিঘর ছিলেন বঙ্গতাজ। ভারতের শরনার্থী শিবিরগুলোর দুর্দশা ও মৃত্যু। তাকে যারপরনাই বিচলিত করে তুলেছিল।

মুখে ইসলামের নাম নিলেও পাক-হানাদারদের আসলেই যে চরিত্র বলতে কিছু ছিল, না হাসান হামিদ দাগাল এ তার প্রামাণ্যচিত্র তুলে ধরেছেন। নেশায় বুঁদ লম্পট পাকিস্তানি জেনারেলরা নিজেদের রাজা-বাদশা মনে করতেন। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট হাউসের পরিবেশ সম্পর্কে লেখক লিখছেন- "এখানে প্রবেশের পর যে কারো নেশা করতে হয় না, এমনি এমনি নেশা ধরে যায়; পরিবেশটা এমন। আশপাশের ড্রেনের মশা মাছি পর্যন্ত উড়তে পারে না, টলে। পানির বোতলের ড্রেনে মদের বুদবুদ হয়।" অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় জালিম ইয়াহিয়া খানের জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণগুলো ইতিহাসে কৌতুক হিসেবেই স্থান পেয়েছে। তার বংশবদ পাক সেনারা এই শ্যামল বাংলার প্রান্তর জুড়ে শুধু রক্তগঙ্গা বয়ে দেয়নি, আমাদের নিরীহ মা-বোনদের উপর সীমাহীন বর্বরতা চালিয়েছিল। তাদের নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা নিরাবেগ পাঠকের চোখেও অশ্রু ঝরায়। অথচ, এদেশের কিছু কুলাঙ্গার ধর্মের দোহায় দিয়ে তাদের অপকর্ম, অশ্লীলতা ও নৃশংসতাকে জায়েজ করার ফন্দি আঁটতেন।

অত্যাচারী স্বৈরশাসক ও তার হানাদার আর্মি অফিসাররা আসলেই যে ভীতু ও কাপুরষ ছিল, দাগাল আমাদের কাছে তার প্রমাণ হাজির করে। লেখক বলছেন, "গভর্নর এমএ মালিক বললেন, -দেখুন, দুই পক্ষ যুদ্ধ করলে একপক্ষ জিতবে, আরেকপক্ষ হারবে। এটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধের কোনো একসময় একজন কমান্ডারকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তাই না? আত্মসমর্পণ করতে হবে শুনার সাথে সাথে নিয়াজি গোঙ্গাতে লাগলেন। কাঁদতে লাগলেন অন্য সামরিক অফিসারাও। নিয়োজি ফোঁপাচ্ছেন আর চোখ মুছছেন। চিৎকার করতে লাগলেন তিনি।"

আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের পরিণতি ও ধূর্ত ভুট্টো কি করে ক্ষমতায় পাশাখেলায় নিজেকে বারবার উপস্থাপন করেছেন কৌতুহলী পাঠক তার খোরাক পাবেন উপন্যাসটিতে।

তেরোশত নদীর এই বদ্বীপকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কী ঘৃনাই না করতেন! লেখক তাদেরই ভাষায় তা তুলে ধরেছেন। অনুসন্ধানী পাঠক এক মলাটেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের নির্মোহ একটা তথ্যচিত্র খোঁজে পাবেন দাগাল উপন্যাসে। নতুন প্রজন্মকে তাদেরই ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা নেহায়েত সহজ কাজ নয়; দাগালে এর লেখক সেই মহৎ চেষ্টা করেছেন।

হাসান হামিদ তার প্রথম উপন্যাস চেহেল সেতুন এ তার আগমনী বার্তা দিয়েছেন। তার গল্প বলার নিজস্ব একটা রিদম আছে, ভাষা আছে। দাগাল এ তিনি একজন সার্থক কথাশিল্পী হিসেবে তার লিগ্যাসিকে পোক্ত করেছেন। একুশ শতকের প্রথম দশকে উপন্যাস লেখায় এক ধরণের স্থবিরতাকে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু দ্বিতীয় দশকে আমরা উপন্যাসে ব্যাপক বৈচিত্র লক্ষ্য করে থাকবো। তরুণ উপন্যাসিকদের মধ্যে হাসান হামিদ অন্যতম প্রতিস্রুতিশীল সন্দেহ নেই। লেখকের জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

আশরাফ চৌধুরী, শিক্ষক
ashrafchybd81@gmail.com