তীব্র সেশন জটের কবলে পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়া, শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের অন্তঃকোন্দল, শ্রেণীকক্ষ সংকট ও বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্স চালু থাকার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। এতে করে দীর্ঘদিন সেশনজটে আটকা পড়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে শিক্ষকরা বলছেন শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় সময়মত ক্লাস-পরীক্ষা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছেন না।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ না করা, ক্লাস নিতে শিক্ষকদের অনীহা ও তীব্র শিক্ষক সংকটের কারণে বিভিন্ন বর্ষে শিক্ষার্থীদেরকে সেশন জটের কবলে পড়তে হয়েছে। বিভাগে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা না নিলেও বাইরের বিভিন্ন প্রজেক্ট ও সান্ধ্যকালীন কোর্সসহ বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্সে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার প্রতি বেশি মনযোগী শিক্ষকরা। ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে ওই কোর্সগুলোতে সময়মতো রেজাল্ট দিলেও নিয়মিত ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে উদাসীন। এজন্য শিক্ষকদের অন্তঃকোন্দলকেও দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইনস্টিটিউটটিতে পাঁচটি বর্ষের বিপরীতে বর্তমানে চলমান রয়েছে ছয়টি ব্যাচ। ছয় ব্যাচে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১১ জন। এর মধ্যে ক্লাস নেন কেবল ৭ জন শিক্ষক। এতে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না।
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, প্রথম বর্ষে দুইটি ব্যাচ, মাস্টার্সে দুইটি কিন্তু চতুর্থ বর্ষে একটি ব্যাচও বর্তমানে নেই। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ২০২০ সালের ২১ শে জানুয়ারি ক্লাস শুরু করলেও এখনো শেষ করতে পারেনি। দীর্ঘ ২৬ মাস যাবৎ তারা একই বর্ষে আছেন।
২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও এখনো ৩য় বর্ষে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন বিভাগ ওই শিক্ষাবর্ষের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষাও গ্রহণ করতে শুরু করেছে। একই অবস্থা ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ব্যাচের ক্ষেত্রেও। তারাও এখনো দ্বিতীয় বর্ষ পেরোতে পারেনি।
ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা বলেন, ইনস্টিটিউটটিতে ৩ জন অধ্যাপকসহ ১১ জন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষকদের এই সংখ্যা শিক্ষার্থীদের তুলনায় অপ্রতুল। এই ১১ জনের মধ্যেও আবার চার জন রয়েছেন বিভিন্ন ছুটিতে। শিক্ষকের সংখ্যা কম হওয়ায় একসাথে ৬টি ব্যাচের ক্লাস-পরীক্ষা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, দীর্ঘ ২৬ মাস ধরে আমরা একই বর্ষে ঝুলে আছি। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ফলে ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম কচ্ছপ গতিতে চলছে। যথাসময়ে ক্লাস শেষ না করা, উত্তরপত্র মূল্যায়নে গড়িমসি ও ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে ক্রমেই বাড়ছে সেশনজট। এতে আমরা পারিবারিক ও মানসিক চাপে হতাশ হয়ে পড়ছি।
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, অন্যান্য বিভাগে ভর্তি হওয়া আমাদের বন্ধুরা পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে ঢুকলেও আমাদের এখনো মাস্টার্স পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে অনেকেই আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছি। আমরা চাই খুব দ্রুত আমাদের পরীক্ষা গ্রহণ করে দীর্ঘ এই সেশন জট থেকে আমাদের মুক্ত করা হোক।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্র বলেন, প্রধানত শিক্ষক সংকটের কারণে সেশন জটের এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষক সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে এক তৃতীয়াংশে রয়েছে। আমাদের একেকজন শিক্ষককে ১০-১৩টি কোর্স পড়াতে হয়। তাই সব বর্ষে সমানভাবে পড়ানো সম্ভব হয় না। তবে ইতোমধ্যে আমরা সব ব্যাচের পরীক্ষার তারিখ ঠিক করেছি।
শিক্ষকদের অন্তঃকোন্দলের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে অন্তঃকোন্দলের বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
বিভিন্ন কোর্স চালুর ব্যাপারে তিনি বলেন, যেহেতু এটি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেহেতু এখানে বিভিন্ন কোর্সে গবেষণা করতে হয়। তাই এই কোর্সগুলো চালু রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। তাই আমরা চাইলেও শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছি না। আমি মনে করি, শিক্ষক নিয়োগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ইনস্টিটিউটে যোগ্য শিক্ষকদেরকে নিয়োগ দিলেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তারা চাইলেই শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারেন। কিন্তু যেহেতু শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেহেতু তারা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করতে পারেন।