সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়িয়া উঠিয়াছে অনিবন্ধিত ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত খবরে বলা হইয়াছে, অভিযানে নামিয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশে প্রায় ৯০০ অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে সিলগালার পাশাপাশি জরিমানা করিয়াছে। তিন দিনের অভিযানে অংশ লইয়াছে জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কার্যালয়, র্যাব ও পুলিশ। ইতিপূর্বে যেই সকল হাসপাতালের নিবন্ধন ছিল না, তাহাদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। অতঃপর এই সকল অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানাইয়াছে, বন্ধ হওয়া ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার যদি নিবন্ধন গ্রহণ করে, তাহা হইলে তাহারা পুনরায় কার্যক্রম শুরু করিতে পারিবে।
নিঃসন্দেহে এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান মানুষের মনে ইতিবাচক ছাপ ফেলিয়া থাকে। কিন্তু তাহার পরও কথা রহিয়াছে। আমরা ইতিপূর্বে বলিয়াছি যে, একটি জনপদের বিপুলসংখ্যক মানুষের আর্থিক সংগতি ও শিক্ষার অভাব যখন কম থাকে, তখন বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-অসংগতি-অরাজকতা মাকড়সার মতো জাল ছড়াইয়া পড়ে। চতুর শ্রেণির কিছু লোক মানুষের এই অশিক্ষার সুযোগ তো লইবেই। কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে। দেশে আইনকানুন আছে এবং তাহা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন আছে। সুতরাং যেই সকল প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন বৎসরের পর বৎসর প্রকাশ্য দিবালোকে প্রশাসনের নাকের ডগার ওপর বসিয়া নিবন্ধন না করিয়া কিংবা মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পরও ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিয়া আসিতেছিল—তাহারা এতকাল ধরিয়া কী করিয়া চালাইতে পারিল? হঠাৎ কী এমন ঘটিল যে, প্রশাসন তাহাদের বন্ধ করিতে তৎপর হইয়া উঠিল? শুধু স্বাস্থ্য খাত নহে, আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেখা যাইবে অবৈধ এবং নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ছড়াছড়ি। আবাসিক এলাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ খুলিবার নিয়ম নাই। কিন্তু কীসের কী? পয়সা দিলে কোথাও কোথাও সকল অনিয়মই নিয়মে পরিণত হইয়া যায় কিংবা সেই সকল অনিয়ম দেখিবার লোকেরা চোখ বুজিয়া থাকে।
সুতরাং আমরা স্পষ্ট বলিতে চাই, দায়িত্বশীল প্রত্যেকে যদি প্রথম হইতেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করিত, তাহা হইলে প্রায় ৯ শত অবৈধ ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়গনস্টিক সেন্টারের মতো এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এইভাবে পরিচালিত হইতে পারিত না। এইখানে অনেকেই বিনিয়োগ করিয়াছেন। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হইয়াছে। সুতরাং নিয়ম মানিবার ক্ষেত্রে যদি প্রথম হইতেই যথাযথ মনিটরিং হইত, তাহা হইলে এত শত প্রতিষ্ঠান অনিয়মের বেড়াজালে পড়িতই না। বলা হইতে পারে যে, মনিটরিংয়ের লোকের অভাব রহিয়াছে। কিন্তু মনিটরিং করিবার লোকেরা হঠাৎ এক সকালে জাগিয়া উঠিয়া এত শত প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম দেখিল, অথচ ইহার পূর্বে শত শত দিন ধরিয়া কিছুই দেখিল না—ইহা স্বাভাবিক নহে। কেন তাহারা এতগুলি প্রতিষ্ঠানের এত দিন ধরিয়া অনিয়ম করিবার সুযোগ দিল—ইহার জন্য কি সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানদের কোনো জবাবদিহিতা থাকিবে না? জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতার ফলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, অদক্ষতা, কাজে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি নিয়মশৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়।
২০১৮ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, ‘আমি চাই সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতার সঙ্গে আপনারা স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করবেন। আমাদের মূল লক্ষ্যটা হবে মানুষের সেবা করা।’ কিন্তু এই সকল কথা যেন উলুবনে মুক্তা ছড়ানো। যদি প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষ স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে সজাগ থাকিতেন—তাহা হইলে সমাজের সিংহভাগ অভিযোগ ও সমস্যা সহজেই বিদূরিত হইত। মনে রাখিতে হইবে, প্রত্যেকের অপরাধের সাক্ষীস্বরূপ তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে নিজ নিজ জবান এবং হাত ও পা (সূরা-নূর ২৪/২৪)। এমনকি প্রত্যেকের দেহচর্ম ও ত্বক তাহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে (সূরা-হামিম সাজদাহ ৪১/২০-২৩)। অতএব, নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা কাম্য নহে।