বাংলাদেশে করোনা মহামারি এখন নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে। সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হইতে শুরু করিয়াছে। কিন্তু বৃষ্টিপাত বাড়িয়া যাইবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে ডেঙ্গু লইয়া নূতন করিয়া আতঙ্ক দেখা দিতে শুরু করিয়াছে। করোনার আগে এক সময় এই রোগ বাংলাদেশের মানুষকে কাবু করিয়া ফেলিয়াছিল। চিকুনগুনিয়ার নাম এখনো আমরা ভুলিতে পারি নাই। ইহারই মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এক-এক করিয়া বাড়িতেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম হইতে বলা হইয়াছে, বর্তমানে সারা দেশে মোট ৪৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি রহিয়াছে। তাহারা সবাই ঢাকার বাসিন্দা। রাজধানীর বাহিরে কোনো ডেঙ্গু রোগী এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয় নাই। তাহার অর্থ ডেঙ্গু প্রতিরোধের এখনই সময়। সারা দেশে ছড়াইয়া পড়িবার আগেই রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর বংশ বিস্তার রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করিতে হইবে। উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনকে এই ব্যাপারে এখন হইতেই সক্রিয় হইতে হইবে।
মূলত ডেঙ্গু হইল একটি ভাইরাসজনিত রোগ। ইহার কারণে সারা শরীরে অসহ্য ব্যথাসহ জ্বর, সঙ্গে বমি বমি ভাব, চোখের পিছনে ব্যথা ও সারা শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। স্ত্রী এডিস মশা নিজের পেটে এই ভাইরাস বহন করে। প্রথমে মশার লালার মাধ্যমে মানুষের ত্বকের ভিতরে প্রবেশ করে এবং পরে শ্বেত রক্তকোষে ঢুকে। যাহাদের ক্রনিক অসুখ যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, টিবি প্রভৃতি রহিয়াছে তাহাদের ক্ষেত্রে ইহা প্রাণঘাতী হইতে পারে। যেহেতু এডিস মশা দিনের বেলায়, বিশেষত ভোর ও সন্ধ্যার দিকে কামড়ায়, তাই এই সময় সতর্কতা সবচাইতে জরুরি। তাহা ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলি ধ্বংস ও ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হইবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, গত পহেলা জানুয়ারি হইতে গত বুধবার পর্যন্ত সমগ্র দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৬১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হইয়াছেন। এখন পর্যন্ত কেহ মারা যায় নাই। তবে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নিমূর্ল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ‘প্রাক মৌসুম এডিস সার্ভে-২০২২’ নামক যে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হইয়াছে, তাহাতে আমরা উদ্বিগ্ন। তাহাতে বলা হইয়াছে, এইবার রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগী বাড়িবে। এই জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর প্রতি ১০০টি মশার মধ্যে পাঁচটি ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশা। তাই এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করিতে পারে। করোনার পর জনস্বাস্থ্যের উপর আবারও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক, তাহা আমরা কেহ চাহিতে পারি না। সাধারণত জুন হইতে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এখন বলিতেছেন অন্য কথা। তাহাদের মতে, এখন ডেঙ্গু রোগের নির্দিষ্ট কোনো মৌসুম নাই। সারা বৎসরই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইতে পারে। এক হইতে ১০ বৎসরের শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাহা ছাড়া এই রোগ এখন আর নগরকেন্দ্রিক নহে, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা দিয়াছে বিগত কয়েক বৎসর। ২০১৯ সালে সমগ্র দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়াছিল ১ লক্ষ ১ হাজার ৩৫৪ জন। মৃত্যুর সংখ্যা ছিল তিন শতাধিক।
এডিস মশা ঘরের ভিতরে খালি পাত্রে জমিয়া থাকা স্বচ্ছ পানি, ফুলের টব, ফ্রিজের নিচে তিন হইতে পাঁচ দিনের জমিয়া থাকা পানি ও ঘরের বাহিরে ছাদ, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনের পানির ট্যাংক প্রভৃতিতে বংশ বিস্তার করিয়া থাকে। বংশবিস্তার রোধে নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বই বেশি। রাজধানীতে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলিতেছে। এই সকল প্রকল্পের কিছু জায়গায় এডিস মশা বিস্তার লাভ করিতে পারে এবং ইহার প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হইবে।