যানজটে শুধু ঢাকা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলো নয়, ছোট ছোট শহরেও ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারণ করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিবন্ধনহীন যানবাহনের কারণে যানজট ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ২০২২ সালে ঢাকার সড়কে প্রতিদিন ৮০ লাখের বেশি কর্ম-ঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। যানজটের কারণে প্রতিদিন যে কর্ম-ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে তার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।
যানজটের আরেকটি ক্ষতি হলো রাস্তার আয়ুষ্কাল কমে যাওয়া। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি থেমে থাকলে রাস্তার আয়ুষ্কাল ১৮-৩০% কমে। প্রকৌশলীরা রাস্তা নকশার সময় চলমান লোড বিবেচনা করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কয়েক হাজার বাহনে ভরা থাকায় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একটি বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার অসহনীয় যানজটে শুধু মানুষের ভোগান্তি ও কর্মঘণ্টাই নষ্ট হচ্ছে না—এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ও। শুধু ঢাকার যানজটের কারণেই বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৫-১৬ সালের নতুন ভিত্তি বছরের হিসাবে অর্থমূল্যে এই ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। ঐ গবেষণায় আরো বলা হয়, দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতু সবচেয়ে বড় অবদান রাখবে। এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি হলে রাজধানীর যানজটের কারণে প্রত্যক্ষ যে ১ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে, তা দিয়ে তৈরি করা যেত পদ্মা সেতুর সমান দৈর্ঘ্য ও সুবিধার তিনটি সেতু। এতে অবকাঠামোর উন্নয়ন যেমন হতো, তেমনি গতি বাড়ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারত ৩ শতাংশের বেশি।
রাজধানী ঢাকার যানজটের প্রধানতম কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ১৯৭৪ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২০ লাখ আর ২০২১ সাল নাগাদ এই মহানগরের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি। মাত্র ১৬০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঢাকা এত বিপুল লোকসংখ্যার চাপ সইতে পারছে না। ফলে নানাবিধ নাগরিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে এবং এর মধ্যে অন্যতম হলো যানজট।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সীমিত সড়ক ও যানবাহনের আধিক্যই মাত্রাতিরিক্ত যানজটের অন্যতম কারণ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যানজটের কারণে রাজধানীতে গাড়ির গতি এবং মানুষের পায়ে হাঁটার গতি প্রায় সমান। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশ-এর ‘দি ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বলা হয়, যানজটের কারণে রাজধানীতে একটি যান ঘণ্টায় গড়ে ৫ কিলোমিটার যেতে পারে। ১২ বছর আগে এ গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। পাশাপাশি যানজটে শুধু ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্ম-ঘণ্টা অপচয় হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ঢাকা শহরে সামান্য দূরত্বের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেও মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ ও সময়ের অপচয় এখন অস্বাভাবিক মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে।
যানজট কমিয়ে আনার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যারা যানজটের প্রকৃত কারণ নির্ণয়সহ সমাধানের পরামর্শ দেবেন। যানজটের কারণে মূল্যবান শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। দুর্নীতি যেমন অর্থনীতির জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর, তেমনিভাবে যানজট দেশের অর্থনীতির বিরাট ক্ষতি করে চলছে। যানজট একটি নীরব দানব এবং এর থেকে উত্তরণ দরকার। উপরন্তু যানজটের শিকার হয়ে অনেক মানুষ শারীরিক ও মানসিক ভাবেও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কাজেই যানজট নিরসনে অবিলম্বে সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।