নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৃথিবী আজকের সভ্য অবস্থানে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। সভ্যতার এই অগ্রযাত্রায় মানবজাতির উভয় অংশের অবদানই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইহা সর্বজন স্বীকৃত। যদিও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরিয়া নারীরা নির্যাতন, বঞ্চনা, অবহেলার শিকার হইয়া আসিতেছে— এই সত্য অস্বীকার করিবার সুযোগ নাই। তবে বিগত দুই শতককাল ধরিয়া নারীরা এই শোষণের জাল ছিন্ন করিয়া অন্ধপ্রকোষ্ঠ হইতে আলোয় আসিয়া সফলতার বিচ্ছুরণ ছড়াইতেছেন। পৃথিবীব্যাপী নারীসমাজ এখন বহুদূর আগাইয়া গিয়াছে। বিশ্বের সফল নারীদের সহিত তাল মিলাইয়া চলিয়া সফলতার শীর্ষদেশে আরোহণ করিয়াছেন বাংলাদেশের নারীরাও। অগ্রসরমাণ প্রতিটি সেক্টরেই আজ বাংলার সফল নারীদের পদচারণা। এই যখন অবস্থা তখন বিপরীত চিত্রও পরিলক্ষিত হইতেছে। নারীদের প্রতি খড়্গহস্ত হইবার দৃশ্যপট সামনে আসিতেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের একটি সাম্প্রতিক জরিপে উঠিয়া আসিয়াছে, নারীদের জন্য বড় ভীতির কারণ হইয়া উঠিয়াছে গণপরিবহন। ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ নারী বলিতেছেন, গণপরিবহনে যাতায়াতকালে তাহাদেরকে নির্যাতন, হেনস্থা করা হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলিয়াছেন। শিক্ষা-সচেতনতায় অগ্রসরমাণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে নারীর প্রতি পুরুষের এইরূপ ‘হীন আচরণ’ নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত।
নারীদের প্রতি বুলিং, লিঙ্গবৈষম্য, শরীর স্পর্শ, আপত্তিকর সংস্পর্শ নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়া উঠিয়াছে গণপরিবহনগুলিতে। এই সমস্ত অভিযোগকে কোনো ক্রমেই উপেক্ষা করা উচিত হইবে না। ভুক্তভোগী নারীর মনের উপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এই জাতীয় হয়রানি। নির্যাতনের শিকার নারী বিষণ²তা-হীনম্মন্যতায় ভুগিতে থাকেন, ট্রমাটাইজড হইয়া পড়েন। পাবলিক বাস ও বাসস্ট্যান্ডগুলিতে হয়রানি, বডি শেমিংয়ের শিকার নারী শারীরিক-মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হইয়া আত্মহননের মতো বড় দুর্ঘটনার পথে হাঁটিতেছেন। নারীকে এইভাবে অন্ধকারে ঠেলিয়া দাওয়া একটি জাতির পশ্চাত্পদতার লক্ষণ। তবে দুঃখজনক সত্য হইল, হয়রানি-নির্যাতনের শিকার নারীরা তত্ক্ষণাত্ প্রতিবাদ করিতেছেন না, করিলেও ততটা জোরালো নয়। উপরন্তু মুখ বুঝিয়া হজম করিতেছেন অধিকাংশ নারী। এই চিত্র পালটাইতে হইবে। নিচু, হীন মানসিকতা-আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াইতে শিখিতে হইবে। একটা বিষয় মনে রাখিতে হইবে, একটা নির্দিষ্ট চরিত্রের পুরুষ এইরূপ জঘন্য কাজ করিয়া থাকেন। ইহাদের সংখ্যা নিতান্তই কম। এই সকল কাপুরুষের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তুলিতে হইবে। প্রতিবাদে কালবিলম্ব কিংবা উচ্চবাচ্য না করিবার ফলে ইহাদের আশকারা বাড়িয়া গিয়া অসহ্যে পৌঁছাইয়াছে। এই ক্ষেত্রে পুরুষসমাজেরও দায় রহিয়াছে। নারীর প্রতি সহিংসতা-নির্যাতনে সকলের পূর্বে পুরুষেরই আগাইয়া যাইবার কথা, অথচ এইরূপ দৃশ্যপট দেখা যায় কদাচিত্। সন্দেহ নাই—পুরুষের এই নিষ্ক্রিয়তার ফলাফল তিক্ত হইবে। মুষ্টিমেয় কিছু পুরুষের বিকৃত মানসিকতার কারণে নারীদের মনে পুরুষসমাজ সম্পর্কে যেই নেতিবাচকতা বাড়িতেছে—ইহার ভবিতব্য কি সুখকর হইবে?
আলোকিত সমাজের এই স্তরে আসিয়াও নারীর প্রতি পুরুষের হীন মানসিকতা প্রদর্শন অত্যন্ত দুঃখজনক। মানসিকতার সংস্কার জরুরি হইয়া উঠিয়াছে। নারীর সম্মান সমুন্নত রাখিবার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সকলেই সমস্বর, কাজেই এই জাতিকেও এই বিষয়ে ভাবিতে হইবে। এমতাবস্থায়, নৈতিক-পারিবারিক শিক্ষার চর্চা আবশ্যক হইয়া উঠিতেছে—সকল ক্ষেত্রের জন্যই ইহা আজ অতি জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে অনুশাসন বাড়াইতে হইবে। ধর্মীয় আচার-রীতির যথাযথ অনুসরণের অন্যথা নাই। একজন নারীকে দুর্বল জ্ঞান করিয়া সাময়িক সময়ের জন্য ফায়দা লুটিবার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নাই—এই সত্য মাথায় রাখিতে হইবে। নারীর প্রতি হয়রানি বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকেও সময় উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। সর্বোপরি, সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করিতে দরকার নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ইসলাম ধর্ম নারীকে অনেক উচ্চতর আসনে স্থান দিয়াছে—এই সত্য ভুলিয়া গেলে অন্যায় হইবে। ‘পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি, চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’—এই বাণীর বিস্মৃতি ঘটিলে শিক্ষিত জাতি হিসাবে আমাদের গর্ব ধুলায় মিলাইবে।