রাসায়নিক দ্রব্যসামগ্রীর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা

সর্বত্রই অনিয়ম, অবহেলা, অসতর্কতা ও অসাবধানতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। অনিয়মই নিয়মে পরিণত হইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন সেক্টরে। সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোর অগ্নিকাণ্ড-বিস্ফোরণ ইহারই প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করিয়া কেমিক্যালের মতো বিপজ্জনক দ্রব্যসামগ্রীর যত্রতত্র মজুত মারাত্মক বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতে পারে—এই সতর্কবাণী বহুবার উচ্চারিত হইলেও ইহাতে কর্ণপাত করেন নাই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। 

তাহাদের এই উপেক্ষার খেসারত গুনিতে হইল—বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অকালে ঝরিয়া গেল অর্ধশত তাজাপ্রাণ। এরূপ চিত্র নূতন নহে। বহুবার অসাবধানতার আগুনের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করিয়াছি আমরা। নিমতলী বিস্ফোরণ, তাজরীন ফ্যাশন কিংবা চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের মতো বহু ঘটনা এক একটি ট্র্যাজিক হিস্ট্রি। এই সকল ট্র্যাজেডির পর আলোচনায় উঠিয়া আসে কেমিক্যাল ও রাসায়নিক দ্রব্যের অবৈধ মজুতের বিষয়টি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে দেশে ১ লক্ষ ৬৮ হাজারের অধিক অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছে। 

তদন্তে পাওয়া গিয়াছে, এই সকল অগ্নিকাণ্ডের অধিকাংশের সূত্রপাত ঘটিয়াছিল কেমিক্যাল ও রাসায়নিক দ্রব্য হইতে। রুটিন বিরতিতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিতে থাকিলেও কেমিক্যালের মজুত কিংবা পরিবহনের বিষয়ে কোনো নীতিমালা তৈরি করা হয় নাই। দেশে ব্যবহৃত কেমিক্যালের শতকরা ৯৫ শতাংশই আমদানি করিতে হয়। ৩১ ধরনের অতি দাহ্য কেমিক্যাল ছাড়াও আরো বহু রাসায়নিক দ্রব্য আমদানির প্রয়োজন পড়ে। বিপুল পরিমাণ আমদানির প্রয়োজন পড়িলেও কেমিক্যাল-রাসায়নিক দ্রব্যসামগ্রীর সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে উদ্যোগ লওয়া হয় নাই। মজুত, পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ—প্রতিটি পর্যায়েই অবহেলা-অরাজকতার মাত্রা ছাড়াইয়া গিয়াছে। এই সেক্টরের সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যেও অসচেতনতা রহিয়াছে। ফলে প্রায়শ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলি ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করিতেছে।

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকিলেও ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। কেমিক্যাল আমদানি, রপ্তানি, মজুতের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির অনুসরণ করিতেছেন না এই দেশের এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। ফ্ল্যাট, বাসাবাড়িতে অবৈধভাবে মজুত করা হয় কেমিক্যাল ও রাসায়নিক দ্রব্য। এমনকি পাশের ব্যক্তিও আন্দাজ করিতে পারেন না যে, তিনি দাহ্য বস্তুকে সঙ্গে করিয়া বসবাস করিতেছেন। অতীতে পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই চিত্র দেখা গিয়াছে। সীতাকুণ্ডের ঘটনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র—কেমিক্যালভর্তি কনটেইনারগুলিতে কোনো ধরনের সতর্কতামূলক চিহ্ন বা সতর্কমূলক বার্তা লিখা নাই। কনটেইনারগুলি পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে রাখা হইয়াছিল। সাধারণ শ্রমিক কিংবা ফায়ার ফাইটাররা বুঝিতেই পারেন নাই যে, কনটেইনারগুলি কেমিক্যালে ভর্তি। 

দুঃখজনক হইলেও সত্য, ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও কনটেইনার ডিপোগুলিতে কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নাই। ডিপোতে অন্যান্য সাধারণ পণ্যের সহিত কেমিক্যাল কিংবা রাসায়নিক দ্রব্য রাখা হয়। তাহা ছাড়া ডিপোর মালিকদের কেমিক্যাল রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বারংবার সতর্ক হইবার ব্যাপারে বলা হইলেও তাহারা আমলে নেন নাই। ‘ডেঞ্জারাস কার্গোস অ্যাক্ট, ১৯৫৩’ অনুযায়ী কেমিক্যাল, রাসায়নিক পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নেভির অনুমোদন লওয়া বাধ্যতামূলক। আমদানি এবং রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সকল নিয়মকানুন মানা হইতেছে না। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। উন্নত দেশে কেমিক্যাল পরিবহন করা গাড়িগুলিতে বিশেষ চিহ্ন বা সতর্কতামূলক বার্তা লিখা থাকে। আমাদের দেশে শুধু জ্বালানি তৈল পরিবহনকারী ট্যাংকলরিগুলিতে এই পদ্ধতির প্রচলন থাকিলেও কেমিক্যালবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার যথাযথ অনুসরণ করা হয় না। উপরন্তু উন্নত দেশে কেমিক্যাল বহন করা কনটেইনার বা গাড়ির চালকরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হইয়া থাকেন। আমাদের দেশে এমন কোনো নীতিমালা নাই। এই সমস্ত বিষয় লইয়া ভবিতে হইবে।

আমদানি করা কেমিক্যাল বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদিত গোডাউনে মজুতের নিয়ম থাকিলেও তাহা মানিতেছেন না অসাধু ব্যবসায়ীরা। পুরান ঢাকাসহ রাজধানীতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদিত গোডাউন রহিয়াছে ১৩৭টি। অথচ সেইখানে কেমিক্যাল গোডাউন রহিয়াছে প্রায় ৫ হাজার। মার্কেট ও জনবহুল বিপণিবিতানসহ প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিচের বেইজমেন্টের গোডাউনে রহিয়াছে অতি দাহ্যপদার্থ। কেমিক্যাল-সংশ্লিষ্ট বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করিয়া কিছুদিন পর ঝিমাইয়া পড়িতে দেখা যায়। এই প্রবণতা হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। অবিলম্বে কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনার নীতিমালা প্রণয়ন করিতে হবে। আমরা আর কোনো নিমতলী, চকবাজার বা সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি দেখিতে চাহি না।