সাধারণ জনগণকে কর দিতে হইবে—উহাই স্বাভাবিক। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনযাপনে করের প্রকোপ কী হইবে, তাহাই আলোচ্য প্রতি বৎসরের জুন মাসে। জুন মাস মানেই বাজেট, কে কী পাইল তাহার চুলচিরা বিশ্লেষণ। এইখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা জনগণের ঘাড়ে বরাবরই রহিয়াছে। কিন্তু এইবারে বিশ্ব জুড়িয়া পণ্যমূল্যের যে অবস্থা, তাহাতে বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি বাজেট অত্যধিক মনোযোগের দাবি রাখে। সেই মনোযোগ অর্থমন্ত্রী যথার্থভাবে দিয়াছেন বলিয়া বুঝা যায় নাই। তবে তিনি চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করিয়াছেন।
করোনার পর, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তাবৎ বিশ্বের অর্থনীতিকেই উলটপালট করিয়া দিয়াছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও সামাজিক অস্থিরতার কথা, চরম খাদ্যসংকটের আশঙ্কার কথা বলিয়াছে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক প্রভাবে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশচুম্বী। এমন পরিস্থিতিতে ক্রয়ক্ষমতা বাড়াইবার পদক্ষেপগুলি স্পষ্ট করেন নাই অর্থমন্ত্রী। তাহার বাজেট বক্তৃতায় তিনি সমস্যাগুলি চিহ্নিত করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন। কিন্তু কর্মসংস্থান কিংবা আয় বাড়াইবার বিষয়ে ততোধিক গুরুত্ব দিতে পারেন নাই। বরঞ্চ তিনি কৌশলে চাহিদার লাগাম টানিয়া ধরিবার মাধ্যমে সামঞ্জস্য আনিবার কথা বলিয়াছেন। যাহা আসলেই জুঁতসই হইবে না। কেননা, বিশ্বপরিস্হিতি এখনো অনিশ্চয়তায়। ফলে, ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকার ঘাটতি যে আরো বাড়িবে না, তাহা এখুনি বলা যাইবে না। সেই পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্ত্ততির কোনো ধারণা নেই অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়।
সাধারণ জনগণের জন্য বাজারের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থমন্ত্রী বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করিয়াই বলিয়াছেন, ‘আবারও কথা দিচ্ছি বাজারে অস্থিরতা থাকবে না।’ কিন্তু বাজারে গিয়া দেখা যাইতেছে বাজেট ঘোষণার দিনও পণ্যমূল্য বাড়িয়াছে। আসলে ‘মেকানিজম’টা কী হইবে, তাহার ওপর নির্ভর করিবে পরিস্থিতি কতটা অনুকূলে থাকিবে। তাই চাহিদায় লাগাম টানা নহে, বরঞ্চ আয় বাড়াইয়া, ক্রয়ক্ষমতা বাড়াইলে বাজারের স্থিরতা ফিরাইয়া আনা সহজ হইবে। মনে রাখিতে হইবে যে, বাজারকে তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতে দিতে হইবে। এইখানে হুমকিধমকি দিয়া কাজ হইবে না। এই ধরনের হুমকি সরবরাহ ব্যবস্হাকে বিপাকে ফেলিবার জন্য যথেষ্ট। প্রস্তাবিত বাজেটে কতিপয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে কিছু সুবিধা দেওয়া হইয়াছে। করপোরেট কর হার কমানো হইয়াছে। কিন্তু সর্বনিম্ন ব্যক্তির আয়কর সীমা বাড়ানো হয় নাই। এটি ৫ লক্ষ টাকা করা উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। কারণ, একজন ব্যক্তি শুধু প্রত্যক্ষ করই দেন না, বরঞ্চ পরোক্ষ করও দিয়া থাকেন। প্রতিটি পণ্য ও সেবার বিনিময়েই তিনি কর দিয়া থাকেন। সেই বিষয়টি বিবেচনায় না রাখিলে করদানে উত্সাহ বাড়িবে না।
নতুন অর্থবত্সর তথা ২০২২-২৩ অর্থবত্সরের বাজেটটির আকার হইতেছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের বাস্তবায়ন কীভাবে হইবে? রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নহে। বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে শিল্প-ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব চলিতেছে। ব্যবসায়-বাণিজ্য না বাড়িলে রাজস্ব আদায়ও বাড়িবে না, যাহা চলতি অর্থবছরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই বছরেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হইয়াছে। নতুন বত্সরেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হইবে না। ফলে, বছর শেষে বাজেটের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও সম্ভব হইবে না। যেই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলিয়া থাকেন, বাজেট আসলে বাস্তবায়নযোগ্য করা হউক। জাতির সামনে বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করিয়া বাহবা নিয়া কী লাভ? স্বাধীনতার পর হইতে এই পর্যন্ত কোনো বাজেটেরই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নাই। সেই ট্র্যাডিশন ভাঙিবার এমন বাজেট কবে হইবে, যাহা বাস্তবায়নযোগ্য হইবে—সেই দিনের প্রত্যাশা কি অমূলক হইবে?