দেশে নাগরিকসেবার এই কী হাল! সরকারি অফিস-আদালত এখনো জনবান্ধব হইল না। সরকারি দপ্তরগুলিতে সহজে কোনো সেবা পাওয়াটা আজও কঠিন। ডিজিটালাইজেশনের কারণে কোনো কোনো দপ্তরের কাজ গতিশীল হইয়াছে বটে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত সেবাপ্রাপ্তি আজও সুদূর পরাহত। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের সুফলও মানুষ পাইতেছে না। বিশেষত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে এক একটি নাগরিকসেবা পাইতে মানুষকে আজও চরম ভোগান্তির শিকার হইতে হইতেছে। পদে পদে বাড়িতেছে বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগ। যেমন—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিবাহের নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, চাকুরিতে নিয়োগ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, জমির নিবন্ধন, গ্যাস-পানি-বিদু্যত্-টেলিফোনের সংযোগ, ট্রেডলাইসেন্সসহ ১৮টি মৌলিক নাগরিকসেবা পাইতে লাগে জন্মনিবন্ধন সনদ; কিন্তু খোদ এই সেবাটি পাইতেই মানুষের ঘুম হারাম হইয়া যাইতেছে। ২০০১ সাল হইতে এই কার্যক্রম শুরু হইবার পর ইতিমধ্যে ২১ বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে। ইহার পরও আমরা কেন একটি কার্যকর জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে পারিলাম না? এই ব্যর্থতার দায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কিছুতেই এড়াইতে পারে না।
গতকাল ইত্তেফাকের এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, নূতন জন্মনিবন্ধন গ্রহণ, নামের সংশোধন কিংবা ওয়েবসাইট বা অনলাইনে আপডেট করিতে আসিয়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক অফিসগুলিতে মানুষ ধরনা দিতেছেন; কিন্তু অপ্রতুল জনবল, জটিল নিয়মকানুন, অনিয়ম, অসদ্ব্যবহার ইত্যাদির কারণে সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগের শেষ নাই। নির্ধারিত ফরমে আবেদন করিয়াও দিনের পর দিন তাহারা ঘুরিয়াও জন্মনিবন্ধন সনদ পাইতেছেন না। ভুল সংশোধনের জন্য তাহাদের ডিসি অফিসেও যাইতে হইতেছে। উপরি বা বকশিশ না দিলে হয়রানি করা হইতেছে। সাধারণ মানুষ জন্মসনদ-সংক্রান্ত সেবা পাইতে সরকারি অফিসগুলিতে কেন ভিড় করিতেছে তাহাও এখানে একটি বিবেচ্য বিষয়। অনেকে এক যুগ পূর্বে হাতে লিখা জন্মনিবন্ধন সনদ পাইয়াছিলেন; কিন্তু তাহার তথ্য ওয়েবসাইটে না দেওয়ায় এখন তাহাদের আবার দেনদরবার করিতে হইতেছে। আবার যাহাদের অনলাইন সনদ আছে; কিন্তু সনদ নম্বর ১৭ ডিজিটের কম, তাহাদের তথ্যও ওয়েবসাইটে না থাকায় সমস্যা তৈরি হইয়াছে। অন্যদিকে ওয়েবসাইটে জন্মনিবন্ধনের তথ্য থাকিলেও অনেকের নামের বানানসহ ছোটখাটো ভুল রহিয়াছে এবং তাহা সংশোধন করিতে গিয়া শরীরে ঘাম ছুটিয়া যাইতেছে। এই যে জন্মনিবন্ধনকে কেন্দ্র করিয়া এতগুলি সমস্যা তৈরি হইয়াছে, তাহা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের চরম গাফেলতি ও দায়িত্বহীনতার বহিঃপ্রকাশ। তাহারা নাগরিকদের এই সংক্রান্ত তথ্য যথারীতি সংরক্ষণ ও ওয়েবসাইটে আপডেট করিতে কার্যত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছেন।
বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা গড়িয়া উঠিয়াছে। যদিও সংশোধন প্রক্রিয়া এখানেও জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াটি এতদিন পরও কেন সহজ ও সাবলিল হইবে না? ২০০৪ সালের জন্ম ও মৃতু্য নিবন্ধন আইন প্রণয়নের পর ২০০৬ সাল হইতেই অনলাইনে জন্মনিবন্ধন সনদ ইসু্য করিবার কাজ শুরু হয়। তাহা হইলে পুরাতন জন্মনিবন্ধন সনদ ওয়েবসাইটে যুক্ত করা গেল না কেন? নূতন ওয়েবসাইট ও সার্ভার চালু করিবার সময় আপডেটে সমস্যা হইল কেন? আমরা মনে করি, সরকারি অফিসগুলিতে আইটি খাতে দক্ষ লোকদের যথাসময়ে নিয়োগ দেওয়া হইতেছে না এবং অদক্ষ ও অকর্মণ্য লোকদের নিয়োগ দেওয়ার কারণে সরকারি সেবা পাইতে প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে ট্যাক্স প্রদানকারী জনগণকে সীমাহীন কষ্ট করিতে হইতেছে। কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তাহাদের এই দুর্ভোগ দেখিয়া বসিয়া থাকিতে পারে না। অতএব, জন্মনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়কে কীভাবে আরো জনবান্ধব, দক্ষ, গতিশীল করা যায় তাহা লইয়া নূতন করিয়া চিন্তাভাবনা করিতে হইবে। নিয়মনীতিগুলিকে সহজ করিয়া হাসিমুখে নাগরিকসেবা দিতে হইবে এবং নাগরিকগণ যাহাতে হাসিমুখে সরকারি অফিস হইতে বিদায় লইতে পারে তাহার সুব্যবস্থা করিতে হইবে। যাহারা একাধিকবার জন্মনিবন্ধন লইয়াছেন, তাহাদের ব্যাপারেও সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।
পড়ুন