কুমিল্লা সিটি নির্বাচন বুধবার, জয় নিয়ে আশাবাদী মেয়র প্রার্থীরা

বুধবার (১৫ জুন) তৃতীয় বারের মতো কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন ইত্তেফাকের কুমিল্লা প্রতিনিধি লুত্ফুর রহমান। এ সময় নির্বাচনে নিজেদের জয় নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তারা। 

  • কালোটাকা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নৌকা জয়ী হবে: রিফাত

কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত এবার সিটি মেয়রের পদটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারবেন বলে আশাবাদী। তিনি বলেন, এখন দল অনেক বেশি সংগঠিত, কোনো বিরোধ নেই। কালোটাকা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবার নৌকার জয় হবে বলে তিনি শতভাগ আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেছেন।

জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত এই সংগঠক জানান, কুমিল্লাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন আছে। বললেন, প্রাচীন এ শহর নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে, স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেক পরিকল্পনাও আছে। তাই প্রতীক পেয়েই ১১ দফা অঙ্গীকার উল্লেখ করে নগরবাসীর হাতে হাতে লিফলেট বিতরণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছেন এবং এই লিফলেট-ই তার নির্বাচনি ইশতেহার বলে জানান তিনি। নগরবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আসুন—একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন করি, কুমিল্লাই সারা দেশকে পথ দেখাবে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর প্রসঙ্গ আসলে এক হাত নিয়েছেন আওয়ামী লীগের এই মেয়র প্রার্থী। সাক্কুকে ব্যর্থ মেয়র উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাক্কু পরিকল্পিত নগরী গড়ার কোনো কাজই করেননি, নগরীকে ধ্বংস করে ফেলেছেন। নগরীর উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন, বিজয়ী হলে সাক্কুর দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন। নগর ভবনকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন, তা না পারলে পদত্যাগ করবেন— এটা চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি।

আগের দুই বার আওয়ামী লীগের পরাজয় সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে আওয়ামী লীগে কোন্দলের কারণে টানা দুইবার নৌকা পরাজিত হয়েছে— তা ঠিক না। ২০১২ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনের আগে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের কোনো কমিটি ছিল না। দ্বিতীয় নির্বাচনের পর প্রথম কমিটি হয়েছে।

ভোটের মাঠে এমপি বাহারের প্রভাব বিষয়ে তিনি বলেন, স্বতন্ত্র দুই প্রার্থীর (সাক্কু-কায়সার) এমন অভিযোগ মিথ্যা, নৌকার জোয়ার দেখে তারা এমন উদ্ভট অভিযোগ করছেন। এছাড়া নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের পর একটি পত্রিকায় মাদকপৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ এনে এক রিপোর্ট প্রকাশের বিষয়টি পুরোপুরি ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেন রিফাত। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আদালতে মামলা করেছি। অতীতে কখনো তার বিরুদ্ধে মাদকের কোনো মামলা নেই। এমন অপপ্রচার ভোটের মাঠে প্রভাব পড়বে না। মেয়র পদে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৩ জন দেরিতে নৌকার প্রচারণায় মাঠে নামায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলেন তিনি।

  • নির্বাচন সুষ্ঠু ও শঙ্কামুক্ত হলে এবারও বিজয়ী হব : সাক্কু

টানা দুই বারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু এবার তৃতীয় বারের মতো মেয়র পদে প্রার্থী। এবার আবার ভোটে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে জানালেন, জনগণের অনুরোধে তিনি প্রার্থী হয়েছেন। বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের সেবা করেছেন। এভাবে নগরীর প্রতিটি এলাকায় তার একটি নিজস্ব বলয় গড়ে উঠেছে।

এবার নির্বাচনী অঙ্গীকারের ব্যাপারে বলেন, ২০১৭ সালের নির্বাচনের আগে ২৭ দফা নির্বাচনি ইশতেহার দিয়েছিলাম। এর ৭০ শতাংশের কাজ হয়েছে। এবার নির্বাচিত হলে বাকি ৩০ শতাংশ কাজ করব, এটাই ছিল অঙ্গীকার। শেষ পর্যায়ে এসে আরো ১৮ দফা যোগ করে কুমিল্লাকে বিশ্বমানের শহরে পরিণত করার ইশতেহার ঘোষণা করেছি।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি দলের (বিএনপি) সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মেয়র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির সেই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি বলেন, দল তাকে ছাড়লেও তিনি দল ছাড়েননি, কাজে প্রমাণ করবেন।

তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই অতিবৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা হয়। নগরীর যানজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে সকল প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কিছু করা সম্ভব না। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, মুখে তো অনেক কথাই বলা যায়, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন বিষয়। নৌকার প্রার্থী এক বছরের মধ্যে এই যানজট-জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে না পারলে সরে দাঁড়ানোর যে চ্যালেঞ্জ করেছেন তা নিতান্তই হাস্যকর বক্তব্য, আগে তিনি নির্বাচিত হয়ে চেয়ারে বসুন—তারপর এসব কথা বললে মানাবে।

দুর্নীতি ও কালো টাকার বিষয়ে তিনি বলেন, রিফাত তো সরকারি দল করেন, এই শহরের বাসিন্দা। গত দুই মেয়াদে মেয়র ছিলাম, কই তখন তো আমার বিরুদ্ধে একটি শব্দও বলেননি। এখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় তিনি (রিফাত) মনগড়া মিথ্যাচার করছেন। তিনি বলেন, রিফাত কী সরকার! দুদকের কর্মকর্তা! নাকি আদালতের জজ!— তিনি আমার দুর্নীতির বিচার করার কে? দুর্নীতি করে থাকলে সরকার আছে, তদন্ত হবে, প্রমাণিত হলে বিচার হবে। এভাবে কথা বলা ঠিক না। সাক্কু বলেন, অনেক উন্নয়ন করেছি। প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সহায়তায় দুই দফায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কাজ করলে কোনো সমস্যা থাকবে না। অপর স্বতন্ত্র প্রার্থীর (নিজাম উদ্দিন কায়সার) বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তাকে নিয়ে চিন্তা করি না। সাক্কু বলেন, নির্বাচন কমিশন মুখে যা বলছে, বাস্তবে তা দেখছি না। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শঙ্কামুক্ত নির্বাচন হলে এবারও তিনি বিজয়ী হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

সাক্কু বলেন, কুমিল্লা একটি প্রাচীনতম জেলা। তিনি বিলুপ্ত কুমিল্লা পৌরসভার দুই বারের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দুই মেয়াদসহ প্রায় ১৬ বছর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নগরবাসীর সেবা করে যাচ্ছেন।

  • নগরবাসী এবার পরিবর্তন চায়, তারা আমাকেই বেছে নেবে: কায়সার

কুসিকের এ নির্বাচনে পাঁচ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে বয়সের দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ ও প্রচার-প্রচারণার মাঠে বেশ আলোচিত প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার । স্বতন্ত্র এই প্রার্থী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা রিফাত ও বিএনপির খোলস পড়ে আওয়ামী লীগের মেয়র হওয়া সাক্কু—দুই প্রার্থী মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নগরবাসী এবার পরিবর্তন চায়, তারা আমাকেই বেছে নিবে। আমি নির্বাচিত হলে বৈষম্যহীন উন্নয়নের মাধ্যমে এক নতুন কুমিল্লা নগরবাসীকে উপহার দেব।

তিনি আরো বলেন, দুই বারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বিএনপির ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি প্রথম মেয়র হয়ে আওয়ামী লীগের মেয়র হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। তার (সাক্কু) নেতাকর্মীদের দ্বারা বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা-হামলার শিকার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশেই সিটির টাকা লোপাট করেছেন। এখন আওয়ামী লীগের প্রার্থীও তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ করছেন। এখানে তার (সাক্কু) দ্বারা দল ও দলের নেতাকর্মীরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মেয়র হিসেবেও তিনি জনজীবনের সমস্যা দূর করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দলের নেতাকর্মী ও ভোটাররা এবার সাক্কুকে প্রত্যাখ্যান করবে। তাই নগরবাসীর অনুরোধে তিনি প্রার্থী হয়েছেন বলে জানান।

তিনি বলেন, নগরীর প্রধান সমস্যাগুলো শনাক্ত করেছি, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যানজট, জলাবদ্ধতা, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত নগরী গড়ে তোলা। আধাঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরী তলিয়ে যায়। ১০ বছরে কোটি কোটি উন্নয়নের বরাদ্দ কাজে আসেনি। অপরিকল্পিত ও ভাগাভাগির কাজের কারণে জনগণের ভোগান্তি আরো বেড়েই চলছে। তাই নির্বাচিত হলে যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসন করাই হবে একমাত্র ও প্রধান কাজ। তিনি বলেন, দল থেকে বহিষ্কার হলেও এ নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে কায়সার বলেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন চাইলে অবশ্যই একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু তাদের পদক্ষেপ তেমনটা দেখছি না। স্থানীয় এমপি এলাকায় অবস্থান করে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার বেশ কয়েকটি অভিযোগ থাকার পরও তারা তাকে (এমপি) চিঠি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলেন, অথচ তিনি এখনো এলাকায় আছেন। তাই নির্বাচনটা কতটুকু ভালো হয় তা নিয়ে সকল মহলেই প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, ভোটারদের মাঝে বেশ আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস দেখছি। রাস্তায় হেঁটে গেলে এখন পেছনে দেখি শত শত মানুষ আর মিছিল। আশা করি, ভোটের মাঠে এর প্রতিফলন দেখতে পাব, বিজয়ী হবো—ইনশাআল্লাহ।

নিজাম উদ্দিন কায়সার কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। পরে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তিনিও দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হয়েছেন। তিনি তার ভগ্নিপতি আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক এবং সাবেক এমপি।