জনশুমারি ও গৃহ গণনা

প্রতি বৎসর দেশে জনসংখ্যা বাড়িতেছে। ইহার সহিত বাড়িতেছে ঘরবাড়িও। পরিবর্তন আসিতেছে খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন কিছুতে; কিন্তু গত এক যুগে আমাদের দেশে আদমশুমারি হয় নাই। নিয়মিতভাবে আদমশুমারি না হইলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিকল্পনা গ্রহণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। যেমন: খাদ্যপণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য যদি হাতে না থাকে, তাহা হইলে আমদানির পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হইবে। এই জন্য তথ্যের সঠিকতা নির্ণয়ে আদমশুমারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আশার কথা হইল, করোনা মহামারির সংকট কাটাইয়া উঠিয়া অবশেষে আজ হইতে সপ্তাহব্যাপী সমগ্র দেশে ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহ গণনা-২০২২-এর কার্যক্রম শুরু হইতেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) নেতৃত্বে এই কার্যক্রম শেষ হইবে আগামী ২১ জুন তারিখে।

আদম বা জনশুমারির একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রহিয়াছে। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম উইলিয়াম ১০৮৬ সালে ‘ডুমস ডে বুক’ নামে প্রথম জমি বা জমিতে বসবাসকারী মানুষের একটি জরিপ পরিচালনা করেন। ইহার পর ১৭৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ১৮০১ সালে ফ্রান্সে প্রথম বারের ন্যায় আদমশুমারি পরিচালিত হয়। এখন বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই ইহার প্রচলন রহিয়াছে। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে প্রথম আদমশুমারি ও গৃহ গণনা করা হয়। ইহার পর ১৯৮১, ১৯৯১, ২০০১ ও ২০১১ সালে এইরূপ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২৩ লক্ষ ১৯ হাজার। ইহার পর ২০১৬ সালে জনসংখ্যার যে প্রাক্কলন করা হয়, তাহাতে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৬২ লক্ষ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধরিলে বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করিতেছে ১৮ কোটিরও অধিক মানুষ। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি মনে করে বাংলাদেশের জনসংখ্যা কমপক্ষে ২০ কোটি। জনশুমারি যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হইলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব হইবে। এই বার ডিজিটাল পদ্ধতিতে (জিআইএসভিত্তিক ডিজিটাল ম্যাপ ব্যবহার করিয়া ট্যাবের মাধ্যমে) শুমারি অনুষ্ঠিত হইতেছে বিধায় সঠিক তথ্য পাইবার ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী।

জনশুমারি ও গৃহ গণনার মূল উদ্দেশ্য হইল দেশের প্রতিটি খানা (হাউজ হোল্ড) ও খানার সদস্যগণকে গণনা করিয়া দেশের মোট জনসংখ্যার হিসাব নিরূপণ করা, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা, জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা ইত্যাদি। এইবার দেশে অবস্থানরত দেশি নাগরিকের পাশাপাশি বিদেশি ও প্রবাসীদেরও গণনার আওতায় আনা হইতেছে। এই জন্য শুমারিকর্মীরা যখন ঘরে ঘরে যাইবেন, তখন তাহাদের সঠিক ও নিভু‌র্ল তথ্য দিতে হইবে। প্রয়োজনে নিজ উদ্যোগে হটলাইনে (০৯৬০২৯৯৮৮৭৭) ফোন দিতে হইবে। যেই সকল মানুষ চর, হাওর বা উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করেন কিংবা ভ্রাম্যমাণ, তাহাদের তথ্য সংগ্রহেও কর্মীদের যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে হইবে। কোনোভাবেই যাহাতে কেহ বাদ না পড়েন, সেই ব্যাপারে ৪ লক্ষাধিক শুমারিকর্মীকে সতর্ক থাকিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে প্রচার-প্রচারণা (উদ্বুদ্ধকরণ গান, নাটিকা, ডকুড্রামা, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, মাইকিং ইত্যাদি) ভালোমতো না হইলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নহে। জনশুমারির মাধ্যমে সঠিক জনসংখ্যার তথ্য পাওয়া গেলে জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সমাধান করা সহজতর হইবে। ইহার মাধ্যমে জানিতে পারা যাইবে পরিবার, নারী-পুরুষ, শিশু, বিভিন্ন পেশা, শিক্ষা, আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য। এই শুমারির মাধ্যমে জনতাত্ত্বিক এই সকল বৈশিষ্ট্য নিরূপণসহ দেশের সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হইবে। অতএব, আমরা জনশুমারি ও গৃহ গণনা ২০২২-এর সাফল্য কামনা করি। জনশুমারির তাৎপর্য উপলব্ধি করিয়া সর্বস্তরের জনগণের উচিত এই কার্যক্রমে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা।