অ্যামিলয়েডোসিস: পারভেজ মোশাররফ যে গুরুতর রোগে আক্রান্ত 

কদিন আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পারভেজ মোশাররফের মৃত্যুর খবর। কিছুক্ষণেই জানা গেলো তথ্যটি ঠিক নয়। তিন সপ্তাহ রোগজর্জর থাকার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আক্রান্ত হয়েছেন এমন এক বিরল রোগে, যার চিকিৎসা নেই। তিনি আক্রান্ত হয়েছেন 'অ্যামিলয়েডোসিস' নামে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে।  

এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা একবার নজর দিতে পারি এই রোগের দিকে। আধুনিক সময়ে কোনো বিরল রোগ মানে এই নয় যে, এই রোগটি কম মানুষের হয়। বরং বলা চলে এই রোগটি আস্তে আস্তে অনেকেরই হতে পারে। তাই আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।   

অ্যামিলয়েডোসিস আসলে কী? 
খাবার গ্রহণের সময় খাদ্যতালিকায় প্রোটিন থাকবে, এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব প্রোটিন কি একইরকম? অবশ্যই না। তেমনই একটি প্রোটিনের নাম অ্যামিলয়েড। যখন এই প্রোটিন দেহের নানা অঙ্গে জমাট বাঁধে তখন অ্যামিলয়েডোসিসের মতো দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। বিশেষত কিডনি, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কে জমাট বাধার পর মূল সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অর্গান ফেইলিওরে মৃত্যু ঘটতে পারে।  

সচরাচর এই প্রোটিনটি মানবদেহে এত সহজে পাওয়া যায় না। খাবারের সঙ্গে আমরা যে প্রোটিন গ্রহণ করি, তাদের গঠন থেকে এই প্রোটিনটি গঠিত হতে পারে। অনেক সময় অন্য অসুখের সময় এই প্রোটিন মানবদেহে উৎপাদিত হয় অথবা প্রবেশ করে। তবে যদি অসুখের কারণে অ্যামিলয়েডোসিস হয়, তাহলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। তবে চিকিৎসকরা এখনো নিশ্চিত নন, ঠিক কী কারণে এই রোগ হয়।

অ্যামিলয়েডোসিস এর ধরন
সমস্যা হলো নানা ধরনের প্রোটিনের প্রভাবে দেহে অ্যামিলয়েড উৎপন্ন হয়। মূলত প্রোটিনের ধরন এবং কোথা থেকে এই প্রোটিনটি পাওয়া যাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে আপনার অবস্থা। অনেক সময় এই প্রোটিন দেহের একটি নির্ধারিত অঙ্গেই জমাট বাধে। কখনো পারভেজ মুশাররফের মতো সারা শরীরেই জমাট বাধে। কখনও বা সংক্রামক রোগের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে।

প্রথমটি লাইট চেন অ্যামিলয়েডোসিস
এর মধ্যে লাইট চেন অ্যামিলয়েডোসিস সবচেয়ে বেশি হয়। মূলত কিডনি ও প্লিহাতে এটি হয়। যাদের অস্থিমজ্জায় সমস্যা আছে, তাদের দেহে এই প্রোটিন উৎপন্ন হয়। দেহে অস্থিমজ্জা লাইট চেন ও হেভি চেনের মাধ্যমে এন্টিবডি উৎপন্ন করে। কিন্তু অস্থিমজ্জার সমস্যা থাকলে প্লাজমা কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়। এতে লাইট চেন প্রোটিন বেশি উৎপন্ন হয়। অতিরিক্ত প্রোটিন রক্তে মিশে দেহে জমাট বাঁধে। এতে চিকিৎসায় নিরাময় পাওয়া কঠিন।  

সেকেন্ডারি অ্যামিলয়েডোসিস
ক্রমিন সংক্রম যেমন রুমাটয়েড আর্থাইটিস, আলসারেটিভ কোলাইটিস থেকে এই অ্যামিলয়েডোসিস হয়। আবার যারা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ডায়ালাইসিসে যাচ্ছেন, তাদেরও এই রোগ হতে পারে। রক্তে উৎপন্ন বিটা টু মাইক্রোগ্লোবিউলিন জমে এই রোগ হয়।

ট্রান্সথিরেটিন অ্যামিলয়েডোসিস
বংশানুক্রমিকভাবে অ্যামিলয়েডোসিস হতে পারে।

অ্যামিলয়েডোসিস এর লক্ষণ

  • প্রচণ্ড ক্লান্তি কাজ করে
  • ওজন কমে যেতে শুরু করে
  • পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে শুরু ক্রে
  • পা-গোড়ালি ফুলে যায়
  • শরীর অসাড় হয়ে যায়
  • চোখের নিচে বেগুনি ছোপ পড়ে
  • কোথাও কেটে গেলে রক্ত জমাট বাধে দেরিতে
  • জিভ ফুলে যায়
  • ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট হয়

চিকিৎসা 
অ্যামিলয়েডোসিস হলে বহুদিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। এর উন্নতি অত্যন্ত ধীরগতির। তবে এর চিকিৎসা একেবারেই নেই তা বলা যাবে না, যদিও একে এখনো দুরারোগ্য ব্যাধিই বলতে হবে। কেমোথেরাপির মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়। আবার ক্যানসার কোষ নিধনে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তা-ই এই  রোগেও ব্যবহার করা হয়।

একথা নিশ্চিত, অ্যামিলয়েডোসিস হলে আপনাকে ভুগতে হবে। আবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে আর ধৈর্যধারণ করলে আপনি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভও করতে পারেন। তাই নিয়মিত নিজের হেলথ চেকআপ করিয়ে নিন।