শ্রেষ্ঠ জীব কেন এত যুদ্ধোন্মাদ?

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ গড়াইয়াছে চতুর্থ মাসে। এখনো যুদ্ধ থামিবার কোনো লক্ষণ নাই। বরং এই যুদ্ধ অস্থিরতা তৈরি করিয়াই চলিতেছে সমগ্র বিশ্ববাজারে। দুই দিন পূর্বে এএফপি ও এনডিটিভি জানাইয়াছে যে, চলমান রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ২৫ শতাংশ ফসলি জমি হারাইয়াছে ইউক্রেন। ইতিপূর্বে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা জানাইয়াছে, যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের ২০ হইতে ৩০ শতাংশ জমি চলতি মৌসুমে অনাবাদি বা চাষের আওতার বাহিরে থাকিয়া যাইবে। ইতিমধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বাড়িয়াছে সকল ধরনের পণ্যের মূল্য। বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করিতেছে। কোথাও কোথাও সেই ক্ষোভ সহিংস রূপ লইতেছে।

এই যে সারা বিশ্বে এত অস্থিরতা, যুদ্ধের ডামাডোল, তাহার গভীর কারণ তো অবশ্যই আছে। কারণ যাহাই থাকুক না কেন, যুদ্ধ যে হইতেছে এবং তাহাতে সাধারণ মানুষ মারা যাইতেছে, নিজভূমি হইতে পালাইয়া অন্য দেশে শরণার্থী হইতেছে— এই ক্ষতি তো মানবতার। এই লজ্জা তো সমগ্র মানবজাতির। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে সৃষ্টি করিয়াছেন। মানুষ কি তাহার সেই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখিতে পারিতেছে? প্রাক-সভ্যতার যুগ হইতেই মানুষ ছিল যুদ্ধবাজ। যুদ্ধ করিতে করিতেই তথাকথিত সভ্য হইয়াছে এবং আমরা বিস্ময়ের সহিত উপলব্ধি করিতে পারি— যুদ্ধ ছাড়া মানুষের ইতিহাসের পাতা একরকম সাদা থাকিয়া যাইবে। প্রস্তর যুগ হইতে শুরু করিয়া আধুনিক এই তথাকথিত সভ্য সময় পর্যন্ত মানুষ লক্ষাধিক বড় বড় যুদ্ধ করিয়াছে। ‘ওয়ার্ল্ড বিয়ন্ড ওয়ার’ সংস্থা হইতে জানা যায়, ৫০০ খ্িরষ্টপূর্ব হইতে ২০০০ খ্িরষ্টাব্দের মধ্যে সহস্রাধিক প্রধান প্রধান যুদ্ধ সংঘটিত হইবার ইতিহাস নথিভুক্ত হইয়াছে। বিংশ শতাব্দীতে আনুমানিক ১৬৫টি যুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়াছে। দুঃখজনকভাবে বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতের ৭৫ শতাংশই হইলেন বেসমারিক নাগরিক— যাহাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও দরিদ্র মানুষ।

কিন্তু সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে মানুষের ইতিহাস তো অন্যরকমও হইতে পারিত! অসভ্য হইতে সভ্য হওয়া পর্যন্ত মানবজাতি প্রতিটি মানুষের জীবনরক্ষা তথা উপকার করিবার জন্যই তো অধিক মনোযোগী হইতে পারিত। কিন্তু উপকারের পরিবর্তে কেন মানুষ নিজেদের ক্ষমতা দেখাইতেই অধিক অস্থির হইয়া উঠিয়াছে। মানুষের জীবনাচরণ স্ববিরোধিতায় পরিপূর্ণ। অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে সবচাইতে বড় পাপ বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। নরহত্যার ভয়ানক পরিণাম সম্পর্কে সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে— একজন নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করিবারই নামান্তর। আর কোনো ব্যক্তি যদি কাহারো প্রাণ রক্ষা করেন, তিনি যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করিলেন। এই কথা দ্বারা অনুধাবন করা যায় যে, পৃথিবীতে প্রতিটি মানবজন্ম কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মানুষই ইউনিক এবং অনন্য। প্রতিটি মানুষের রহিয়াছে বাঁচিবার অধিকার। সকল ধর্মেই এই আপ্তবাক্য স্পষ্ট করা হইয়াছে যে, নরহত্যা মহাপাপ। পৃথিবী তো নিয়মশূন্য হইয়া যায় নাই। কিন্তু কিছু ক্ষমতাধর মানুষ যেন কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না।

ক্ষমতার মদমত্তে মানুষের মনস্তত্ত্ব জটিল হইয়া যায়। এই জন্য বলা হয়— যুদ্ধ মূলত আয়োজিত হয় মানুষের মনে। প্রাচীনকালে দেখা যাইত সাধারণত, একটি একক মানুষের মনেই যুদ্ধেচ্ছা জাগিত। ক্রমশ তিনি তাহা ছড়াইয়া দিতেন তাহার গোষ্ঠীতে। এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। ইতিহাসের নিকট কোনো অপরাধের ক্ষমা নাই। ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘পথ ও পাথেয়’ নামের একটা প্রবন্ধে লিখিয়াছিলেন— ‘আমি যাহা করিব সকলকেই তাহা করিতেই হইবে, আমি যাহা বলিব, সকলকে তাহা বলিতেই হইবে এইরূপ বলপ্রয়োগে দেশের সমস্ত মত, ইচ্ছা ও আচরণ-বৈচিত্রে্যর অপঘাতমৃতু্য তুল্য।’ আমাদের পৃথিবী তো একটাই। তাহাকে তো রক্ষা করিতেই হইবে। না হইলে মহাবিপদ কড়া নাড়িবে সকলের দরজায়।