খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল’

বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে এবার মোংলাবন্দরের জন্য একটি ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল’ তৈরি করছে। মঙ্গলবার (২১ জুন) দুপুরে খুলনা শিপইয়ার্ড চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন (কিল লেয়িং) করা হয়। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল’র মাধ্যমে সার্চ ও রেসকিউ মিশন এবং মেরিটাইম সার্ভিলেন্স প্রভৃতি কার্যাদি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। যা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং মোংলা বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বন্দরে পরিণত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পদ্মাসেতু চালু হলে মোংলাবন্দরের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

তিনি বলেন, একসময়ের মৃত প্রায় মোংলাবন্দর এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বন্দরে জাহাজের কোন জট নেই। এই বন্দরে আটটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। মোংলাবন্দরে অত্যাধুনিক ৭৫টি কার্গো ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং উপকরণ যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বন্দরের জন্য ৬টি ভেসেল নির্মাণ করা হবে। যার মধ্যে আজ একটির নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হলো। মোংলাবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই ভেসেল একটি বড় অর্জন।

স্বাগত বক্তৃতায় খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর এম সামছুল আজিজ বলেন, খুলনা শিপইয়ার্ড এ পর্যন্ত যুদ্ধ জাহাজসহ সর্বসাকুল্যে ৭৭৫টি জাহাজ নির্মাণ ও ২ হাজার ৩৬৩টি জাহাজ মেরামতের কাজ সম্পন্ন করেছে। এ পথ পরিক্রমায়, খুলনা শিপইয়ার্ড লি. বিভিন্ন ধরণের জলযানসহ বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জন্য বিভিন্ন যুদ্ধ জাহাজের পাশাপাশি ২টি হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল ও ২টি জরিপ বোট নির্মাণ করে হস্তান্তর করেছে।

তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। খুলনা শিপইয়ার্ড সেই জায়গায় বাংলাদেশের এক নম্বর ব্রান্ড হিসেবে কাজ করছে। ৬৫ বছরের অভিজ্ঞতায় দক্ষ জনবল দিয়ে কাজের প্রতিটি স্তরে মান-নিয়ন্ত্রণ এবং কোয়ালিটি নিশ্চিত করা হয়। ব্যবসা নয়, সেবার উদ্দেশ্যেই খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর এম সামছুল আজিজ। এছাড়াও অনুষ্ঠানে অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য নির্মিতব্য ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল’ একটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ জাহাজ যাতে অত্যাধুনিক মেশিনারি ও যন্ত্রপাতি সংযোজিত হবে। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেলটি আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি ব্যুরো ভেরিটাসের (ফ্রান্স)  নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মাণ করা হবে।

খুলনা শিপইয়ার্ড সূত্র জানায়, নির্মিতব্য ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেলের দৈর্ঘ্য ২৭.৭৫ মিটার, প্রস্থ ৬.২০ মিটার, গভীরতা ৩.৪২ মিটার, ড্রাফট: ১.৮৫ মিটার, প্রোপালশন টুইন স্ক্রু ফিক্সড পিস প্রোপেলার, সর্বোচ্চ গতি ২৫ নটিক্যাল মাইল, হাল ম্যাটেরিয়াল অ্যালুমিনিয়াম ও  জনবল ৬ জন। এছাড়া এর গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারি ও ইকুইপমেন্টের মধ্যে মেইন ইঞ্জিন  দুটি ১ হাজার ৬৩০ কিলোওয়াট, এমটিইউ, ইউএসএ, জেনারেটর একটি ১৪৬ কেভিএ ও একটি ৪৫ কেভিএ ট্রান্স ডিজেল, ইইউ, ডেক ক্রেন  একটি ৩ টন, সিটেকমা, স্পেন, রেসকিউ বোট একটি জোডিয়াক, ইউকে একটি স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এবং একটি ওয়েলি ওয়াটার সেপারেটর, নেভিগেশন ও কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট  মাল্টিবিম সোনার, ডিজিপিএস, নেভিগেশন রাডার, এলআরআইটি, ইপিআইআরবি, কম্পাস, রাব ডার, ইকো-সাউন্ডার, এআইএস, জিপিএস, ভিএইচএফ সেট ইত্যাদি এবং ইলেক্ট্রিক্যাল সুইচ বোর্ড  ইউরোপ অরিজিন।

খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড প্রায় ৬৫ বছর আগে যাত্রা শুরু করে। এরপর মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর সরকার বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। তারপর থেকেই এ প্রতিষ্ঠানটি তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করে। খুলনা শিপইয়ার্ড বর্তমানে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছর এর নীট মুনাফা ৪৩ দশমিক ২২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।