সমস্যা থাকিবেই, অধৈর্য হইলে চলিবে না

চারিদিকে সমস্যার অন্ত নাই। সংকটেরও শেষ নাই। অস্থিরতা পুরা বিশ্ব জুড়িয়াই। দুঃখজনকভাবে এই ঘোলা পানিতে অনেক সুযোগসন্ধানীই মাছ শিকারে নামিয়া পড়িয়াছে। অথচ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী দুর্ভোগের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত। যদিও এত হতাশার কিছু নাই। অন্ধকার তথা রাতের বিপরীতে যেমন দিন আছে, তেমনি সকল দেশেই কিছু কাজের মানুষ আছেন, যাহারা এই সকল সমস্যা সমাধানে উদয়াস্ত পরিশ্রম করিয়া থাকেন। মানুষকে এখন আর অজ্ঞতার অন্ধকারে রাখা সম্ভব নহে। যে কোনো ফরম্যাটে হউক, মানুষের নিকট সত্য তথ্য কোনো না কোনো ভাবে ঠিকই পৌঁছাইয়াই যায়। সুতরাং যাহারা সমস্যার ভিতরে পানিঘোলা করিয়া মৎস্য শিকার করিতে নামিয়াছেন, তাহারাও নিজেদের লুকাইয়া রাখিতে পারিবেন না। আর বৈশ্বিক সংকটের সময় যাহা দরকার, তাহা হইল ধৈর্য।

আসলে এই জগতে কখনো এমন দিন আসিবে না, যখন আপদ বলিয়া কিছু থাকিবে না। মঙ্গলের পাশাপাশি অমঙ্গল থাকিবেই। অমঙ্গল কাহারই কাম্য নহে বটে। তবে ভুলিয়া গেলে চলিবে না—মঙ্গল ও অমঙ্গলের উৎপত্তি কিন্তু একই শেকড় হইতে। এই কারণে কিশোরবেলা হইতেই আমাদের শেখানো হয়—অমঙ্গলকে জগৎ হইতে হাসিয়া উড়াইয়া দেওয়ার চেষ্টা করিও না, তাহা হইলে মঙ্গলসমেত উড়িয়া যাইবে। আমরা কেন ভুলিয়া যাই যে, একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আধাসামন্তবাদী সমাজ হইতে আমাদের উত্তরণ ঘটিয়াছে। কোনো অন্ধকরাই রাতারাতি দূর হয় না। ইহাও দূর হইতে সময় লাগিবে। চারিদিকে তাকাইলে আমরা কিন্তু এখনই অনেক পরিবর্তন দেখিতে পাইব। এককালের অন্ধকারই যেমনই শেষ কথা ছিল না, তেমনটি এই আধা-অন্ধকার দিনগুলিও শেষ কথা নহে। তাহা ছাড়া, তৃতীয় বিশ্বের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত জনপদে কোনো শাসনব্যবস্থা যথোপযুক্ত—তাহার মীমাংসা এখনো হয় নাই; কিন্তু আমাদের তো আইনের শাসন মানিতে হইবে। সময়ের প্রয়োজনেই যুগের সহিত তাল মিলাইয়া আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসিয়াছে, আসিতেছে। মানুষের জানালা খুলিয়া গিয়াছে, তৃতীয় বিশ্বের প্রচুর মানুষ আজকাল উন্নত বিশ্বে যাইতেছে, ফিরিয়া আসিয়াছে, তফাৎ বুঝিতেছে। গলদ কোথায়, তাহা বুঝিতেছে। সুতরাং পরিবর্তন আসিবেই। আর ইহার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন তিনটি জিনিস—ধৈর্য, ধৈর্য এবং ধৈর্য। অধৈর্য ও অসহিষ্ণুতার ফল খুব খারাপ হয়। চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াস এই জন্য বলিয়াছেন—ধৈর্যের অভাবের কারণে অনেক বড় বড় সম্ভাবনা ধ্বংস হইয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে ধৈর্য এমন একটি গাছ, যাহার সমস্ত গায়ে কাঁটা; কিন্তু ফল অতি সুস্বাদু। মনে রাখিতে হইবে, মহান সৃষ্টিকর্তা সাফল্যের নিয়ামক রূপে বর্ণনা করিয়াছেন ধৈর্যকে। বিখ্যাত ফারসি কবি জালালউদ্দিন রুমির নিকট ধৈর্য হইল বুদ্ধিমত্তার উত্তম পরিচয়। তিনি মনে করিতেন—ধৈর্য মানে শুধু বসিয়া বসিয়া অপেক্ষা করা নহে, ধৈর্য মানে ভবিষ্যতকে দেখিতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকাইয়া গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাইয়া দিনের আলোকে দেখা।

অনেকে বলিতে পারেন, গ্রিক পুরাণে কথিত সিসিফাসেরও অসীম ধৈর্য ছিল। সিসিফাস বেচারা একটা পাথর খাড়া পাহাড়ের উপরে ঠেলিয়া তুলে, আর পাথরটি গড়াইয়া নিচে পড়িয়া যায়। সিসিফাস পুনরায় পাথরটিকে ঠেলিয়া উপরে তুলে। যতবার তুলে, ততবার পড়িয়া যায়। ধৈর্যকে অনেকে তুলনা করেন কুইনাইনের সহিত। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাহার ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থে বলিয়াছিলেন, ‘কুইনিন জ্বর সারাবে বটে, কিন্তু কুইনিন সারাবে কে?’ আসলে কুইনিন (কুইনাইন) দিয়া দ্রুত ম্যালেরিয়া হইতে নিরাময় লাভ করা গেলেও কুইনাইন এমনই তিক্ততায় ভরা যে, ম্যালেরিয়া ভালো হইয়া গেলেও কুইনাইনের তিতার কারণে রোগীরা যাহারপরনাই কাহিল হইয়া পড়িত। ধৈর্যও তেমনি ধারণ করিতে করিতে অনেকে কাহিল হইয়া পড়েন। কাহিল হইয়া পড়েন বটে; কিন্তু ধৈর্যের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষের ইমানের পরীক্ষাও লইয়া থাকেন। সুতরাং ধৈর্য উত্তম নিঃসন্দেহে। ইহার বিকল্প নাই।