লঞ্চে যাত্রী কমেছে, খরচও উঠছে না

পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ নিয়ে এলেও লঞ্চ মালিকদের ব্যবসায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। যাত্রী কমেছে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে কোথাও কোথাও ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বা কোথাও তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থায় লঞ্চ পরিচালনার খরচও উঠছে না। ফলে লোকসান দিয়ে লঞ্চ চালু রাখতে হচ্ছে। তবে এ অবস্থা অচিরেই কেটে যাবে। যাত্রীরা আবারও লঞ্চের আরামদায়ক যাত্রায় ফিরবে আশা লঞ্চ মালিকদের।

যাত্রীরা বলছেন, এখন অনেক কম সময়ে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সব জেলায় পৌঁছানো যায়। ঢাকা থেকে ঝালকাঠি লঞ্চে যেতে সময় লাগে ১০ ঘণ্টা। যেখানে পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে সড়ক পথে আসতে সময় লাগে মাত্র ৪ ঘণ্টা।

লঞ্চ মালিকরা বলছেন, প্রথমবার পদ্মা সেতু দেখার জন্যও অনেকেই সড়ক পথে যাচ্ছে। এ কারণে লঞ্চে যাত্রী কমেছে। তবে আরামদায়ক যাত্রা হিসেবে লঞ্চের বিকল্প নেই। সময় একটু বেশি লাগলেও ভাড়াও এক তৃতীয়াংশ বা তার চেয়েও কম।

গত পয়লা জুলাই বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় মাত্র চারটি লঞ্চ। যেখানে অন্যান্য সময় যায় পাঁচ-ছয়টি। লঞ্চের সংখ্যা কমার কারণ হিসেবে মালিকরা বলছেন, ঢাকা-বরিশাল যাওয়াআসা করতে একটি লঞ্চের বিভিন্ন ফি ও তেল খরচসহ সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। খরচও উঠছে না।

আগে একটি লঞ্চের ডেকে ৫০০ থেকে ৭০০ যাত্রী আসাযাওয়া করত। সেখানে গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত বরিশাল থেকে প্রতিদিন গড়ে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ যাত্রী। যাত্রীসংকটে কোনো ঘোষণা ছাড়াই লঞ্চগুলো এখন ডেকের ভাড়া সাড়ে ৩০০ থেকে কমিয়ে ৩০০/২০০ টাকাও নিচ্ছে। যাত্রী টানতে ডেকের পাশাপাশি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৪০০ এর স্থলে ১ হাজার ৩০০ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার ৪০০ এর স্থলে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে রাখছে কয়েকটি লঞ্চে।

তবে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ৬ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা থেকে নিয়মিত সার্ভিসের পাশাপাশি স্পেশাল সার্ভিসেরও কেবিনের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।

লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের স্বত্বাধিকারী মো. সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, বর্তমানে কেবিনে যাত্রী আগের চেয়ে একটু কমেছে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে যাত্রী ১০ থেকে ২০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। আগামী দুই-এক মাস যাত্রী একটু কম হবে। পরে আবারও স্বাভাবিক হবে বলে মত দেন তিনি।

পটুয়াখালী থেকে ঢাকা আসাযাওয়া করে সুন্দরবন-১৪। লঞ্চের সুপারভাইজার ইউনূস হোসাইন বলেন, যাত্রীসংকটে আছি। এ কারণে লঞ্চ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতি ট্রিপে ২ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত সোমবার পটুয়াখালী থেকে ঢাকা আসার সময় ডেকে যাত্রী ছিল মাত্র ১২৫ জন। অথচ অন্যান্য সময় ৩০০ যাত্রী পাওয়া যেত। এছাড়া লঞ্চটিতে ১৪০টি কেবিন রয়েছে। সোমবার ৬৬টি কেবিনই যাত্রীশূন্য ছিল। এভাবে চলতে থাকলে লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প আর কিছু থাকবে না বলে জানান লঞ্চের কর্মকর্তারা।

এমভি ফারহান লঞ্চের স্টাফ মো. সুমন জানান, মঙ্গলবার ঢাকা থেকে ঝালকাঠি এসেছি প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে। কিন্তু এ রকম সময়ে বিশেষ করে ঈদের তিন/চার দিন আগে আমরা ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ যাত্রী নিয়ে আসি। এমনও হয়েছে, সকালে ঝালকাঠির যাত্রী নামিয়ে দিয়ে দিনের বেলাতেই ঢাকা চলে গিয়ে আবার যাত্রী নিয়ে আসতাম। এখন এ চিত্র নেই। কেবিনের কিছু চাহিদা থাকলেও ডেকের যাত্রী অনেক কমে গেছে।

রাজারহাট-বি লঞ্চের সুপারভাইজার দুলাল মিয়া বলেন, যাত্রী কমছে, আবার জ্বালানির দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় খরচ বেশি হচ্ছে। তবু যাত্রী আকৃষ্ট করতে ভাড়া কমানো হবে।

তবে প্রভাব পড়েনি ভোলা রুটে। ঢাকা থেকে ভোলা জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন ঘাট থেকে অন্তত ৩৪টি লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করছে। ঈদ উপলক্ষ্যে আরো ছয়টি লঞ্চ নতুন যুক্ত হয়েছে। ভোলা সদর (ইলিশা) ঘাট থেকে সাড়ে চার ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো যায়। পদ্মা সেতু ব্যবহারে যাত্রীকে বরিশাল হয়ে আসতে হবে। ভোলা থেকে বরিশাল আসতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। ভোলা-বরিশাল সেতু হলে ভোলা জেলাবাসী পদ্মা সেতুর প্রকৃত সুফল পাবে।