সকলকে ঠান্ডা মাথায় কাজ করিতে হইবে

প্রতিটি পরিবর্তনই মানুষের মনে নূতন আশা-আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে। মানুষ আশায় বুক বাঁধিয়া থাকে, পরিবর্তনকে কেন্দ্র করিয়া তাহার জীবনেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসিবে। এই জন্য সে যে কোনো ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করিতে প্রস্তুত হয়। এমনকি জীবন বাজিও রাখিয়া থাকে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, কোনো পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনিতে পারে না। আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল অনেক সময় চলিয়া যায় অন্যের ঘরে। এমনকি জনগণ যাহাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করিল, একসময় দেখা যায় তাহারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আগের মতোই বা তাহার চাইতেও আরো প্রতাপশালী। তাহাদের অবস্থান শক্তিশালী হইলেও সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তনের খুব বেশি ছোঁয়া লাগে না। তাহাদের অধিকাংশই যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রহিয়া যায়। যাহারা আদমজী পর্যন্ত পায়ে হাঁটিয়া আন্দোলন-সংগ্রাম করিয়াছেন একসময়, পট-পরিবর্তনের পর দেখা গেল তাহাদের অধিকাংশই কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নাই। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য, যাহারা পাকিস্তান আমলে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভু্যদয়ের বিরোধিতা করিয়াছিল, তাহারা বা তাহাদের সন্তানদের অনেকে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ-পজিশনে বেশ ভালো অবস্থানেই রহিয়াছে। তাহা হইলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠিতে পারে, এত রক্তক্ষয় কেন হইল? কেন এত আত্মাহুতি দিতে হইল? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু গণ-আন্দোলনের ব্যর্থতাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এই দেশে তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথার অবসান হইলেও কৃষকদের সেই স্বপ্ন ও আশা পূরণ হয় নাই। সব গণ-আন্দোলনে যেমন সরকারের পতন হয় না, তেমনি পটপরিবর্তন হইলেও আন্দোলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। মানুষ গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়াছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে কি? আমাদের সম্মুখে সবচাইতে বড় উদাহরণ হইল ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লব। ইহাতে পরিবর্তনের ছোঁয়া শুধু সেই দেশ ও অঞ্চলেই নহে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা দিলেও একসময় তাহারও পতন হয়। অর্থাত্ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাহা হইলে কেন এত রক্তপাত ও হানাহানি, মানুষকে উত্তেজিত করিয়া তুলিতে উসকানি? গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ অনুসরণ করিয়া সকল পক্ষ ঠান্ডা মাথায় কাজ করিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হইত না।

অতএব, যাহারা দেশের নেতৃত্ব দিতেছেন তথা ক্ষমতায় আছেন এবং যাহারা ক্ষমতায় আসিতে চাহেন, তাহাদের উভয়কে ঠান্ডা মাথায় ভাবিতে হইবে। জনগণকে অযথা উত্তেজিত করিয়া কোনো লাভ নাই। এই অস্থিরতা চায় কাহারা? যাহারা মনে করে এই সমাজকে ভাঙিতে হইবে। কিন্তু জিজ্ঞাসা করিলে অনেক ক্ষেত্রে তাহারা বলিতে পারিবে না তাহারা আসলে কী চায়। আজ একটি দেশে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দখল করিয়া রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তন ডাকিয়া আনিতেছে, তাহার সুফল আসলে তাহারা নিজেরা কতটা পাইবে? আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের স্লোগান ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, সর্বস্তরে বাংলা চালু কর, পুলিশি জুলুম চলবে না’ ইত্যাদি। কিন্তু রাজপথ কাঁপানো ও ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী সেই সকল জনতার আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হইয়াছে? ১৯০ বৎসর যে বিদেশি শাসনে ছিলাম, তাহাদের রাজভাষার দাপট কি এখনো সর্বত্র নাই? কিছু সুফল আমরা ভোগ করিতেছি বটে, কিন্তু সেই বহু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো অধরা। সবচাইতে বড় কথা হইল, এখন বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি করোনা মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইত্যাদির অভিঘাত মোকাবিলা করিয়া চলিয়াছে। সরকারগুলির ব্যর্থতার বড় কারণ ইহাই। অতএব, ইহা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিয়া সকল পক্ষকে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে হইবে।