কেন এইভাবে পালাইতে হয়!

সদ্য পদত্যাগকারী শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে কোনো রকমে সিঙ্গাপুরে পালাইয়া গিয়া জীবন রক্ষা করিয়াছেন। পরিস্থিতি এতটাই তাহার বিপক্ষে চলিয়া গিয়াছিল যে, তিনি দেশে বসিয়া পদত্যাগ করিতে পারেন নাই। ১৩ জুলাই তিনি স্বাভাবিকভাবে বিমানবন্দর ত্যাগ করিতে না পারিয়া একটি সামরিক বিমানে করিয়া মালদ্বীপ যান; কিন্তু সেইখানে নিরাপদ আশ্রয় না হওয়ায় তিনি এমিরেটসের একটি কমার্শিয়াল বিমানে সিঙ্গাপুর গিয়া সেইখান হইতে স্পিকারের নিকট ইমেইলের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠাইয়াছেন। এখন তিনি সিঙ্গাপুর হইতে নিরাপদ আশ্রয়ে কোথায় যাইতে পারেন সেই হিসাব কষিতেছেন। অথচ তিনি জনপ্রিয়তা লইয়াই ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়াছিলেন।

কেন এই রকম হয়? কেন জনসমর্থন লইয়া ক্ষমতায় আসিয়া তাহার পর বিক্ষোভের মুখে পালাইয়া বাঁচিতে হয়? ইহার অন্যতম প্রধান কারণ পরিবারতন্ত্র। তাহারই একটি উদাহরণ শ্রীলঙ্কার এই রাজাপক্ষে পরিবার। তাহার ভাই মাহিন্দ রাজাপক্ষে ২০০৫ সাল হইতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই দফা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইয়াছেন; কিন্তু তাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠায় শ্রীলঙ্কার জনগণ তাহাকে ত্যাগ করিয়া মাইথিপ্রালা শ্রীসেনাকে নির্বাচিত করে। ২০১৫ সালেই পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধমে মাহিন্দ প্রধানমন্ত্রী হইতে চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হন। ইহার পর রাজনীতিতে শক্তি ও প্রভাব থাকা রাজাপক্ষে পরিবারের সন্তান গোতাবায়া রাজাপক্ষে ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং তাহার ভাই মাহিন্দকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। অর্থাৎ পরিবারতন্ত্র ছাড়িতে পারেন নাই। পরাজয় মানিয়া না লইবার মানসিকতাও এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করিয়া থাকে। ক্ষমতা ভোগ করিবার মানসিকতা ত্যাগ না করিলে সকল দেশেই এইরূপ ঘটনা ঘটিতে পারে। ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের সময়ও আমরা ইহা দেখিয়াছি। বিক্ষোভের মুখে রেজা শাহ পাহলভীকে রাজতন্ত্র ছাড়িয়া পালাইতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ের আরো উদাহরণ রহিয়াছে। ২০১৯ সালে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভা মোরালেস পালাইয়া মেক্সিকোতে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে ২০২১ সালে ঘুম হইতে উঠিয়া একটি বিমানে চড়িয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালাইয়া যাইতে হইয়াছে। পরে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলিয়াছেন, প্লেনে উঠিবার পূর্বে আমি বুঝিতে পারি নাই, আমি ক্ষমতা ছাড়িয়া যাইতেছি। ইতিহাসে আছে ইহার অসংখ্য নজির। লক্ষণীয়, ক্ষমতা ছাড়িয়া যাইবার পর তাহারা করুণার পাত্র হইয়া থাকেন; কিন্তু সেই করুণাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। আশ্রয় মেলে না। একজন রাষ্ট্র পরিচালক, দেশ পরিচালক যখন ক্ষমতা ছাড়িয়া যাইতে বাধ্য হন এবং কোথাও আশ্রয় গ্রহণ করেন, তাহাকে তখন সাধারণ জীবনযাপন করিতে হয়। আর ১০ জনের চাইতে পার্থক্য কিছু তো থাকেই না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরজীবীর মতো বসবাস করিতে হয়। ইহার চাইতে দুঃখের আর কী আছে। অথচ ক্ষমতায় থাকিবার সময় তাহারা এই ভবিতব্য সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন থাকেন।

ইউরোপ আমেরিকার উন্নত দেশসমূহে এই সমস্যা দেখা যায় না। উলটা করিয়া বলিলে বলা যাইতে পারে, এই সমস্যা না থাকিবার কারণেই হয়তো তাহারা উন্নত। ইউরোপে ক্ষমতায় আসা ব্যক্তি কাহার ভাই, কাহার বোন, কাহার সন্তান বা পুত্র তাহা কেহই জানে না এবং জানিবার প্রয়োজনও হয় না। বিশেষ করিয়া এশিয়ার দেশসমূহে এই সমস্যা প্রকটভাবে দেখা যায়। ২০১০ সালে ইউরোপের দেশ গ্রিসে অর্থনৈতিক ধস নামে। জনমত জরিপে ৭৭ শতাংশ মানুষ তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জর্জ পাপান্ড্রুর প্রতি আস্থাহীনতার কথা বলিলে তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব ত্যাগ করিবার সময় বলিয়াছিলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারের ব্যবসার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। আমাদের রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে স্বজনপ্রীতি ঢুকিয়াছে এবং অর্থের অপচয় হইতেছে।’ পাপান্ড্রুকে দেশ হইতে পালাইতে হয় নাই। এই উপলব্ধি থাকা উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য জরুরি।