প্রকৃতি পর্যায়ের গানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন—‘নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা।/ খেলো খেলো তব নীরব ভৈরব খেলা।’ গানটি তিনি লিখিয়াছিলেন চৈত্রের খরতাপকে উদ্দেশ্য করিয়া। কিন্তু প্রকৃতি এতটাই পরিবর্তনশীল যে, সেই ভৈরব খেলা এখন আমরা দেখিতে পাইতেছি শ্রাবণ মাসেও। ক্যালেন্ডারের পাতায় ভরা বর্ষা—অথচ আকাশে নীলের হাতছানি কিংবা শরতের মতো মেঘমালা! সেই সঙ্গে দাবদাহ। গতকাল অবশ্য অনেক দিন পর একটুখানি সান্ত্বনার বৃষ্টি হইয়াছে, কিন্তু গত ৫ জুলাইয়ের পর হইতে বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলি ছাড়া অন্যান্য বিভাগের জেলাগুলিতে বৃষ্টি হয় নাই বলিলেই চলে। মনে প্রশ্ন জাগিতেই পারে—এই ভরা বর্ষা মৌসুমে আকাশ কেন মেঘ ও বৃষ্টিমুক্ত? উত্তরটি হইল—বাংলাদেশ এবং মধ্য ও উত্তর-পূর্ব ভারতের উপর দিয়া ব্যতিক্রমী বা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ চলিতেছে। কেন এই তাপপ্রবাহ? তাহার উত্তরে বিজ্ঞানীরা এককথায় বলিতেছেন—জলবায়ুর পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তন আজ সারা বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তীব্র দাবদাহে জ্বলিতেছে ইউরোপ এবং আফ্রিকার একাংশ। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙিতেছে একের পর এক। নূতন নূতন অগ্নিশিখার মুখোমুখি হইতেছেন ফায়ার ফাইটাররা। চলতি বত্সরের গোড়া হইতে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত পর্তুগালের ৯৮ হাজার একর জঙ্গল দাবানলে ভস্মীভূত হইয়াছে—যাহা গত বত্সরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
আক্ষরিক অর্থেই প্রায় সারা ইউরোপ দাবানলে পুড়িতেছে। ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া ও মরক্কোতে দাবানল ছড়াইয়াছে। পর্তুগাল ও স্পেনে সাম্প্রতিক সময়ের দাবানলে মৃতু্য হইয়াছে ১ হাজারের বেশি মানুষের। ফ্রান্সে ইতিমধ্যে তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়াইয়া গিয়াছে। মৃদু আবহাওয়ার দেশ হিসাবে পরিচিত যুক্তরাজ্যের বাসিন্দারা প্রথমবারের মতো ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা দেখিতেছেন। বত্সরের উষ্ণতম দিন দেখিতেছে জার্মানি। গত সপ্তাহে পর্তুগালের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি এলাকায় ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হইয়াছে। দেখা যাইতেছে দক্ষিণ ইউরোপ হইতে দাবানল ক্রমশ ছড়াইয়া পড়িতেছে উত্তর ইউরোপের দিকে। স্পেন, ফ্রান্সের পর এইবার ব্রিটেনেও দাবানল ছড়াইয়া পড়িতে পারে। গ্রিস, মরক্কো ছাড়াও চলতি সপ্তাহে ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরিতেও দাবানল ছড়াইয়াছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্হা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করিয়া বলিয়াছে, সবচাইতে খারাপটা এখনো আসে নাই। মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনে দাবদাহ আরো বেশি নিয়মিত, তীব্র ও দীর্ঘস্হায়ী হইতেছে। এই বিষয়ে ডব্লিউএমওর এক কর্মকর্তা বলিয়াছেন—ভবিষ্যতে এই ধরনের দাবদাহ স্বাভাবিক হইতে যাইতেছে এবং আমরা আরো চরম পরিস্হিতির মুখোমুখি হইতে যাইতেছি। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ পাইয়াছেন, আজি হইতে ৩০ বত্সর পূর্বেকার পৃথিবীর কোনো স্হানের ওপর দিয়া প্রতি বত্সর গ্রীষ্মকালে ঠিক যতগুলি তাপপ্রবাহ বহিয়া যাইত—তাহা অপেক্ষা অনেক বেশি সংখ্যক তাপপ্রবাহ বহিয়া যাইতেছে সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অতিবৃষ্টির হার বৃদ্ধি পায় ৭ শতাংশ। সেই সঙ্গে বাড়ে শক্তিশালী সাইক্লোনের হার। অন্যদিকে পৃথিবীর তাপমাত্রা আর ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িলে প্রতি দশকে একবার প্রচণ্ড খরায় অধিকাংশ জমি শুকাইয়া যাইবে এবং চার বার উর্বরতা হারাইবে।
হিট ওয়েভ বা তাপপ্রবাহের ঘটনা ইতিমধ্যেই বাড়িয়াছে ২ দশমিক ৮ গুণ। আর ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়িলে তাহা ৯ দশমিক ৪ গুণ বাড়িবে। সারা বিশ্বের সকল সচেতন মানুষই স্বীকার করিতেছেন যে, মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশের উপর যেই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলিতেছে তাহা মানবসমাজের জন্য একটি ‘লাল সংকেত।’ দুঃখজনকভাবে, অতীতে যেই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ঘটিয়াছে এবং এবং ভবিষ্যতে ঘটিবে—তাহার ফলে জলবায়ুতে এমন সব পরিবর্তন হইয়া যাইতেছে যাহা আর ঠেকানো যাইবে না। ইহার প্রভাবে কয়েক শতাব্দী বা সহস্রাব্দ ধরিয়া পৃথিবীর মহাসাগর, জমিয়া থাকা বরফের স্তর ও সাগরের পানির স্তরের উপর এর প্রভাব দেখা যাইবে। আমাদের তো একটাই পৃথিবী। যেহেতু প্লানেট-বি নাই তেমনি প্লান-বি বলিয়া কোনো বিকল্প নাই। সুতরাং কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন বড় আকারে কমাইতে পারিলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে হয়তো স্হিতিশীল অবস্হায় আনা যাইবে। মুশকিল হইল—এই বিপদ যেমন সকলের, তেমনি ইহাকে সামলাইতেও হইবে সম্মিলিতভাবে।