পর্যটনশিল্পে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

পর্যটনশিল্প পৃথিবীর একক বৃহত্তম শিল্প হিসাবে স্বীকৃত। এই জন্য পর্যটনের গুরুত্ব সকল দেশেই বাড়িতেছে এবং অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত হিসাবে বিবেচিত হইতেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ মিলিয়ন। ২০১৬ সালে তাহা বাড়িয়া দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৩৫ মিলিয়নে। ইহাতে বুঝা যায়, পৃথিবী জুড়িয়া পর্যটন এক ক্রমবর্ধমান ও বিকাশমান শিল্প; কিন্তু পৃথিবীব্যাপী বিরাজমান কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে এই পর্যটন খাত। কেননা লকডাউন ও নানা বিধিনিষেধের কারণে মানুষ একরকম গৃহবন্দিত্ব মানিয়া লয়। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রধানত পর্যটনশিল্পনির্ভর হওয়ায় সেই দেশটি এখন দেউলিয়া হইয়া গিয়াছে; কিন্তু এই মুহূর্তে পর্যটনশিল্পের উন্নতিতে শুধু করোনাই প্রতিবন্ধক নহে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতও দায়ী; কিন্তু এই বিষয়টি লইয়া তেমন কোনো আলোচনা হইতেছে না। ইহা হইতে উত্তরণের পথও অনুসন্ধান করা হইতেছে না।

জলবায়ু পরিবর্তনে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়িয়াছে। পর্যটন খাতের বিপর্যয়গুলিও ক্রমশ স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। যেমন—বর্তমানে অর্ধেক পৃথিবীরও অধিক অংশ জুড়িয়া চলিতেছে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানল। ভয়াবহ দাবদাহ-দাবানলে উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ এখন জ্বলিয়াপুড়িয়া যাইতেছে। আটলান্টিক হইতে প্রশান্ত মহাসাগর হইয়া ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সর্বত্র অসহনীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইয়াছে। স্পেন, পতু‌র্গাল প্রভৃতি দেশে দাবানলে নিহত হইয়াছে ১ হাজারেরও অধিক মানুষ। যুক্তরাজ্য ও ইতালিসহ পাঁচ দেশে ইতিমধ্যে জরুরি অবস্হা জারি করা হইয়াছে। শুধু ইউরোপে নহে, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, ভারত, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়া জুড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এখন ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠানামা করিতেছে—যাহা উদ্বেগজনক। এই পরিস্হিতিতে করোনার পর মানুষ আবার ঘরমুখী হইয়া পড়িয়াছে। আর ইহাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে পর্যটন খাত।

বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, খরা আর প্রচণ্ড দাবদাহের পাশাপাশি নূতন নূতন সংক্রামক রোগ ও বিলীয়মান জীববৈচিত্রে্যর সংকটেও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলি দিনদিন ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িতেছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা এড়াইবার চেষ্টা করিতেছেন পর্যটকরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন সৈকত সংকুচিত হইয়া পড়িতেছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিন স্পেনের মায়োর্কার মতো আকর্ষণীয় পর্যটন সৈকতগুলি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হইয়া যাইতে পারে। ক্যারিবীয় দ্বীপ বাহামা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঘূর্ণিঝড় ডরিয়ানের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। তাপমাত্রার বৃদ্ধিতে বরফ গলায় কিছু অঞ্চলে স্কি রিসোর্টে কৃত্রিম বরফ ছিটাইয়া ঘাটতি মোকাবিলা করা হইতেছে। ইতালীয় উত্তরাঞ্চলের পর্যটনশিল্প এইভাবে টিকাইয়া রাখিবার চেষ্টা চলিতেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত হইতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের পর্যটনশিল্পকে রক্ষা করিতে হইলে এখন হইতেই পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। ইহার সমাধানে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র অনুযায়ী একেক দেশকে একেক উপায় ও কৌশল গ্রহণ করিতে হইবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্হানীয়দের এই শিল্পের উপর নির্ভরতা কমাইয়া অন্য খাতে মনোনিবেশ করিতে হইবে। প্রতিকূল ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার আচরণ লইয়া ভাবিতে হইবে সকলকেই। ইহার সহিত খাপ খাওয়াইয়া চলিবার চেষ্টা করিতে হইবে। যেইভাবে জলবায়ুসহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের জাত আবিষ্কার করা হইতেছে, সেইভাবে প্রচণ্ড দাবদাহ, খরা বা অতিবৃষ্টি মোকাবিলা করিয়া কীভাবে পর্যটন খাতকে চাঙ্গা রাখা যায়, তাহার উপায় লইয়া ভাবিতে হইবে গভীরভাবে। বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন ও ভ্রমণ খাতের অবদান ২ দশমিক ২ শতাংশ। কর্মসংস্হান সৃষ্টিতে এই খাতের অবদান ২ দশমিক ৮ শতাংশ। সুতরাং পর্যটনশিল্পের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গবেষণা ও প্রণোদনা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের সতর্কতা ও সচেতনতার বিকল্প নাই।