হেপাটাইটিস-সি একধরনের সংক্রামক রোগ, যা মূলত লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস (এইচসিভি) এই রোগ সৃষ্টি করে। লিভারের সমস্যা দুই ধরনের হয়ে থাকে—একিউট বা তীব্র সংক্রমণ এবং ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ। মাত্র ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে একিউট বা তীব্র সংক্রমণ হয়ে থাকে। অরুচি, ক্লান্তি, পেশি বা সংযোগস্হলে ব্যথা, উপসর্গসমূহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মৃদু ও অস্পষ্ট। অল্প কিছু আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র সংক্রমণের সঙ্গে জন্ডিস হয়ে থাকে। ১০-৫০ শতাংশ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংক্রমণ চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়।
হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসে আক্রান্ত ৮০ শতাংশ রোগীর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো রকমের উপসর্গ থাকে না। এমনও হয়, এর উপসর্গ বুঝতে ১০-১৫ বছর সময় লেগে যায়। কিছু ক্ষেত্রে ক্লান্তি বা অবসাদ থাকতে পারে। বৃদ্ধিপ্রাপ্ত লিভার এনজাইমের (SGPT, SGOT) কারণ অনুসন্ধানের সময় হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস শনাক্ত হয়। বহু বছর ধরে হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসকে লিভারের ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসে আক্রান্ত এবং শুধু ২০১৯ সালে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে প্রায় ৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত।
মানুষ যেভাবে হেপাটাইটিস-শি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে : এই ভাইরাস সাধারণত রক্ত এবং রক্ত উপাদানের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। পরীক্ষা ছাড়া রক্ত সঞ্চালন, একই ইনজেকশনের একাধিক ব্যবহার, একই সূচের মাধ্যমে একাধিক মানুষের নাক-কান ছিদ্র করা, অনিরাপদ যৌনমিলন, অস্ত্রোপচারে জীবাণুযুক্ত সুই-সুতার ব্যবহার, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্লেড, রেজার ব্যবহারের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। এছাড়া দাতের চিকিৎসা ও কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস এবং শিশু জন্মের সময় মা আক্রান্ত থাকলে শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হেপাটাইটিস-সির চিকিৎসা : বর্তমানে হেপাটাইটিস-সির চিকিৎসা পূর্বের তুলনায় অনেক সহজলভ্য। হেপাটাইটিস-সির ছয়টি ধরন আছে। একই ওষুধের মাধ্যমে এই ছয় ধরনের হেপাটাইটিস-শি ভাইরাসের চিকিৎসা সম্ভব। মুখে খাওয়ার এই ওষুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-শি ভাইরাস প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নিরাময় করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত হলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া লিভার সিরোসিসের প্রাথমিক দিকেও খুব ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। তবে লিভার ক্যানসার হয়ে গেলে এই ওষুধ তখন খুব বেশি কার্যকর হয় না। এসব ওষুধ বেশ ব্যয়বহুল। হেপাটাইটিস-সির এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো টিকা আবিষ্কার হয়নি।
হেপাটাইটিস-শি ভাইরাস সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। শরীরে হেপাটাইটিস-সির জীবাণু আছে কি না, পরীক্ষা করে তা জানতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। অবশ্যই আক্রান্ত ব্যক্তি রক্তসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ দান করবেন না।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক (বাংলাদেশের প্রথম নারী লিভার বিশেষজ্ঞ), এম এইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ