মারাত্মক ব্যাধি ক্যানসার

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

ক্যানসার একটা মারাত্মক ব্যাধি। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে প্রায় ১ লাখই মারা যাচ্ছে। এ রোগে আক্রান্ত হলে শরীরের কোনো একটি স্থানের কোষ (সেল) নষ্ট হয়ে যায় এবং ক্রমে তা সারা শরীরে বিস্তৃতি লাভ করে।

রোগের লক্ষণ

শরীরের কোনো অংশের কোনো কোষ প্রাথমিকভাবে কানসারাক্রান্ত হলে তা কোনো রকম বাহ্যিক অথবা শারীরিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই শরীরের অভ্যন্তরে জোট বেঁধে সম্প্রসারিত হতে থাকে। তারপর যখন তা পরিপূর্ণভাবে রোগের আকার ধারণ করে, তখন বিভিন্ন উপসর্গে তা প্রকাশ ও প্রতিফলিত হয়।

প্রাথমিকভাবে ক্যানসারের কিছু কিছু লক্ষণ অনুমান করা যেতে পারে, তবে এই উপসর্গগুলো দেখা দিলেই তা যে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ, এমন নয়।

ক. শরীরের বহিরাংশে অনেক সময় সৃষ্ট ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। অনেক কারণে এটা হতে পারে। তখন সেটাকে ক্যানসারের লক্ষণ বলে অনুমান করা যেতে পারে।

খ. বিভিন্ন কারণে গলার স্বরভঙ্গ হতে পারে। কাশিও হতে পারে। দুটোই পৃথক রোগ। কিন্তু যখন তা একসঙ্গে হয় এবং তার সঙ্গে আর কিছু উপসর্গ, যথা—গলায় ব্যথা, যন্ত্রণা, নাকে যন্ত্রণা ইত্যাদি যুক্ত হয় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তাকে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে সন্দেহ করা যেতে পারে।

গ. মানুষের শরীরে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের অর্থাত্ বিভিন্ন রঙের এবং আকৃতির আচিল অথবা তিল থাকতে পারে। কিন্তু যদি এই তিল অথবা আচিলের আকার, অবস্থান অথবা রঙের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে, তখন তাকে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে অনুমান করা যেতে পারে।

ঘ. অনেক সময় নাক, গলা, কান, পায়ুপথ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এই রক্তঝরা কোনো কোনো সময় অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে। এই রক্তের রংও অস্বাভাবিক। এটাও ক্যানসারের একটি প্রাথমিক আনুমানিক লক্ষণ।

ঙ. বদহজম এবং অজীর্ণতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয় খাদ্য গলধঃকরণের অসুবিধা, এটাকে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে অনুমান করা যেতে পারে।

চ. অনিয়মিত মলমূত্র ত্যাগ অনেক রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। কিন্তু অনেক সময় এই অনিয়মিততা চরম পরিস্থিতিতে উপনীত হয়। দেখা যায়, কোনো কোনো সময় দিনে-রাতে বহুবার মলত্যাগ করে। আবার কোনো সময় কয়েক দিনের মধ্যে একবারও মলত্যাগ হয় না। কোনো কোনো সময় মলের পরিমাণ খুব বেশি। আবার কোনো কোনো সময় খুব কম। কোনো কোনো সময় খুব পাতলা। আবার কোনো সময় খুব কষা। মলের রংও পরিবর্তিত হয় বিভিন্ন সময়। দুর্গন্ধও হয় অত্যন্ত বেশি। মূত্র বা প্রস াবের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। কখনো কখনো বারবার প্রস াব হয়, কখনো কখনো মোটেই প্রস্রাব হতে চায় না। হলেও তা অনেক কষ্টে। রঙেরও পরিবর্তন হয়। মল-মূত্রের এ ধরনের উপসর্গ হলে তাকে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ বলে সন্দেহ করা যেতে পারে।

ছ. হঠাত্ করে দেখা যায়, শরীরের বিশেষ কোনো স্থানের মাংস একটু শক্ত হয়ে গেছে। এই শক্ত কখনো বেশ কিছুটা স্থান জুড়ে হতে পারে। আবার কখনো ছোট্ট একটা পিণ্ড অথবা গুটির মতো হতে পারে। এটাকেও ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ বলে অনুমান করা যেতে পারে। এ ধরনের ক্যানসার সাধারণত নারীদেরই বেশি হয়। আর তা হয় স্তনে। একে ‘স্তন ক্যানসার’ বলে।

সাধারণত পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি ক্যানসার আক্রান্ত হয়। এর অবশ্য কারণ আছে। সেগুলো প্রসঙ্গান্তরে আলোচনায় আসবে। তবে পুরুষ হোক আর নারী হোক, শরীরের বিভিন্ন স্থানে এই রোগ আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্তের স্থান হিসেবে বাংলাদেশের পুরুষ ও নারীদের আধিক্যের মান নিম্নরূপ—

পুরুষ :গলা ২৫ শতাংশ, মুখগহ্বর ২০ শতাংশ, ফুসফুস ১৫ শতাংশ, গলনালি ৬ শতাংশ, ঠোঁট ৫ শতাংশ।

নারী : জরায়ু ৩০ শতাংশ, মুখগহ্বর ২০ শতাংশ, স্তন ১৫ শতাংশ, গলা ৫ শতাংশ, গলনালি ৪ শতাংশ, ঠোঁট ৩ শতাংশ । অর্থাত্ দেখা যাচ্ছে, দেহের অন্যান্য স্থানে ক্যানসার আক্রমণের হার পুরুষের তুলনায় নারীদের খুব বেশি না হলেও তারা অতিরিক্ত দুইটি স্থানে ক্যানসারাক্রান্ত হয়ে থাকে এবং তা অত্যন্ত বেশি হারে। এ দুটি স্থান হচ্ছে, জরায়ু ও স্তন। উল্লিখিত স্থানসমূহ ছাড়াও শরীরের আরো অনেক স্থানে ক্যানসার হতে পারে।

রোগের কারণ

বিভিন্ন কারণে ক্যানসার হতে পারে। তার মধ্যে প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে—

১. দূষিত পরিবেশ :দূষিত পরিবেশ ক্যানসারের উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে। রাস্তায় যানবাহনের অতিরিক্ত ধূম্র উদিগরণ, কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, বেশি লোকের একত্রে বসবাস ইত্যাদি কারণে পরিবেশ দূষিত হতে পারে। অর্থাত্ এর মাধ্যমে বায়ু দূষিত হয়ে যায়। 

২. বিকিরণ : শরীরের মধ্যে বেশি মাত্রায় বিকিরণ অর্থাত্ এক্সরে, ইসিজি ইত্যাদি গ্রহণ করলে লিউকেমিয়া ধরনের সম্ভাবনা থাকে। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি দেহে প্রতিফলিত হলে সেটাও দেহে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।

৩. ওষুধ : কিছু কিছু ওষুধের প্রতিক্রিয়া ক্যানসারের কারণ হতে পারে। এ ধরনের ক্যানসার সাধারণত নারীদেরই বেশি হয়। গর্ভধারণের প্রথম অবস্থাতে কোনো নারী কৃত্রিম ‘ডাইইথাইল স্টিলবেস্ট্রল’ সেবন করলে তার গর্ভজাত কন্যাসন্তানের জরায়ু ক্যানসারের আশঙ্কা থাকে। এছাড়া মধ্যবয়সি নারীরা বেশি মাত্রায় ‘অ্যাস্ট্রোজেন’ গ্রহণ করলে তার নিজের জরায়ু ক্যানসারের ভয় থাকে। বিশেষ করে কোনো নারীর প্রথম সন্তান জন্মানোর আগে অথবা যদি তার স্তনে টিউমার থাকে, তার ‘অ্যাস্ট্রোজেন’ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করা উচিত নয়।

৪. খাদ্য :কিছু কিছু খাদ্য-খাবার শরীরে ক্যানসার রোগসৃষ্টি ও তার বিস্তৃতি ঘটাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত লবণ বা শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খেলে ক্যানসারের আশঙ্কা থাকে। চর্বিবহুল খাদ্য বেশি খেলে স্তন ও জরায়ু ক্যানসার হতে পারে। অধিক মদ্যপান পুরুষ ও নারী উভয়েরই ক্যানসার আশঙ্কাকে তীব্রতর করে।

৫. ধূমপান :ধূমপান ক্যানসারের সবচেয়ে বড় কারণ। ধূমপানের মাধ্যমে যে ‘নিকোটিন’ শরীরে প্রবেশ করে, তা অতি সহজেই অন্ত্রনালির ক্যানসার সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। এছাড়া পানের সঙ্গে জর্দা, তামাক, দোক্তা, কিমাম ইত্যাদি মাদক জাতীয় পদার্থ ক্যানসার রোগের সহায়ক।

৬. গর্ভধারণ :কম বয়সে গর্ভধারণ নারীদের জরায়ু ক্যানসারের আশঙ্কাকে বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে যৌবন প্রাপ্তির প্রাথমিক স্তরে গর্ভে সন্তান এলে এই ভয় আরো বেশি হয়। এছাড়া ঘন ঘন সন্তান প্রসবকারী নারীদেরও এ ধরনের ক্যানসারগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখক : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা

 

 

ইত্তেফাক/এমএএম