কৃষি আমাদের সংস্কৃতির অনিবার্য অনুষঙ্গ। কৃষি প্রধান এই দেশে সনাতন কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তথা বিজ্ঞান-ভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও কৃষি-বিজ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ষাটের দশকের গোড়ায় গড়ে ওঠা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশের প্রথম উচ্চতর কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আজ (১৮ আগস্ট) ৬২তম বর্ষে পদার্পণ করছে। বিশ্বমানের গুণগত কৃষি শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ৬১ বছর যাবত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিথযশা শিক্ষক ও গবেষকবৃন্দ নিরলসভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান বিতরণ করে চলেছেন এবং ফলে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ লাভ করেছে।
এ দেশের কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য সয়ংস্পূর্ণতার লক্ষ্যে ময়মনসিংহস্থ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ভেটেরিনারি কলেজকে কেন্দ্র করে ১৯৫৯ সালে শুরু হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। পরে কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণের পথিকৃৎ বিদ্যাপীঠ হিসেবে ১৯৬১ সালে ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. এম ওসমান গনি ১৯৬১ সালে প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সনামধন্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. লুত্ফুল হাসান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেশের কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে কৃষিবিদদের সম্মানিত করেছিলেন। কৃষি শিক্ষা ও কৃষিবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদানের ঐতিহাসিক ঘোষণা আজও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে স্লোগান হিসেবে—‘বঙ্গবন্ধুর অবদান-কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’ সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কৃষিবিদগণ সেই মর্যাদা প্রদানের প্রতিদান দিতে পেরেছেন, তাদের কর্মের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ৭ কোটি মানুষের দেশে বিপুল খালি জমি থাকা সত্ত্বেও খাদ্যের অভাব ছিল। কিন্তু এখন আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ার পরেও খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে বহু গুণে, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাও বেড়েছে যথেষ্ট। এ লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মত্স্যসম্পদ সম্প্রসারণ, গবেষণা ও শিক্ষা খাতে নিয়োজিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে উত্তীর্ণ গ্র্যাজুয়েটগণ।
ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ নামে দুটি অনুষদ নিয়ে ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই পশু পালন অনুষদ নামে তৃতীয় অনুষদের যাত্রা শুরু। এরপরে ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ এবং ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে মাত্স্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ছয়টি অনুষদ এবং দুটি ইনস্টিটিউটের আওতায় ৪৪টি শিক্ষা বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষা দান করা হচ্ছে। ৪৬টি শিক্ষা বিভাগে তিন সেমিস্টার মেয়াদে ৪৭টি এমএস ডিগ্রি কার্যক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে ৪০টি বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে বর্ণাঢ্য গবেষণা সাফল্য—গবেষণা প্রকল্পসমূহ সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস) এর তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যে ২ হাজার ৯২২টি গবেষণা প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে এর চলমান প্রকল্পসংখ্যা ৫২৭টি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফসল, মৎস্য ও প্রাণির রোগ দমন পদ্ধতি, ভ্যাকসিন, জাত ও উত্পাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন ডিগ্রিপ্র্রাপ্ত কৃষিবিদগণ আজ ছড়িয়ে আছেন দেশের কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে নিয়োজিত বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকে তারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন। এ যাবত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩০ হাজার ৭৬৪ জন স্নাতক, ২২ হাজার ৯৭৪ জন এমএসসি/ এমএস এবং ৮২২ জন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারের বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিস, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং এনজিওসহ দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীও সংখ্যা ৭ হাজার ১৩২ জন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ এমন একটি পথিকৃৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যা শিক্ষা, গবেষণা প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণের মতো বহুমাত্রিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টারের মাধ্যমে কৃষি গবেষণায় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪১৯’ স্বর্ণপদক লাভ আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। শান্তিপূর্ণ সুষ্ঠু পরিবেশে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আজ আন্তর্জাতিক র্যাকিংয়ে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে পরপর দুইবার প্রথম স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের গ্লোবাল র্যাংকিং সিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ র্যাংকিং ‘সাংহাই র্যাংকিং’-এ ২০২২ সালের প্রকাশিত লাইফ সায়েন্স ক্যাটাগরির ভেটেরিনারি সায়েন্স বিভাগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ প্রথমবারের মতো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ২০০ থেকে ৩০০-র মধ্যে তার অবস্থান নিশ্চিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে বিভিন্ন ধরনের গ্লোবাল র্যাংকিং সিস্টেম চালু রয়েছে। বিশ্ব জুড়ে মূলত টাইমস হায়ার এডুকেশন, কিউএস এবং সাংহাই—এই তিনটি গ্লোবাল র্যাংকিংয়ের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ তিনটিতেই বাকৃবি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে, তা আমাদের জন্য গৌরবের। সাংহাই র্যাংকিং ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, এক্সিকিউটিভ, পলিসি মেকার কর্তৃক সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও সবচেয়ে প্রভাবশালী র্যাংকিং। সাংহাই র্যাংকিং তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন নোবেল পেল, ন্যাচার সায়েন্স এবং কিউ-১ জার্নালে কতগুলো প্রকাশনা, বিবেচনায় নিয়ে এই র্যাংকিং করে থাকে। তাছাড়া সাংহাই র্যাংকিং হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো র্যাংকিং সিস্টেম। সম্প্রতি সাংহাই র্যাংকিংয়ের ২০২২ সালের তালিকায় বাংলাদেশের দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থান লাভ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি হচ্ছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষি উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকদের প্রথমবারের মতো ২০২২ সালে কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সিআইপি মর্যাদায় ১৩ জন ব্যক্তিকে প্রথমবারের এআইপি (এগ্রিকালচারলি ইম্পরট্যান্ট পারসন) পদক বা স্বীকৃতি দিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-এর ভাইস চ্যান্সেলর এবং ডিপার্টমেন্ট অব জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. লুত্ফুল হাসান লবণাক্ততাসহিষ্ণু তিনটি সরিষার জাত এবং বাউধান-৩ উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে সিআইপি মর্যাদায় এআইপি পদক লাভ করেছে। কৃষি গবেষণার জন্য প্রাপ্ত এ স্বীকৃতিতে বাকৃবি পরিবার উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত। এআইপির মতো সম্মাননা আমাদেরকে কৃষি গবেষণার অগ্রযাত্রায় বাকৃবিকে আরো কাজ করতে সাহায্য করবে। কৃষিক্ষেত্রে দৃশ্যমান এ সাফল্যগুলোর কৃতিত্ব এ দেশের কৃষক ও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের, এটি আজ সর্বজন স্বীকৃত। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সমস্যা ও চাহিদা মোকাবিলার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়কে সবসময় তৈরি থাকতে হয়। নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্ববিদ্যালয় এযাবত্ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা একেবারে গৌন নয়। এ উন্নয়নধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আগামী দিনে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি যথাযথ পরিকল্পনা ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এর শিক্ষা ও গবেষণাসহ যাবতীয় কার্যাবলির বিকাশ অব্যাহত থাকবে এবং এর মধ্য দিয়েই কৃষি তথা জাতীয় উন্নয়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ও অবদান আরো ফলপ্রসূ হবে। আমাদের অর্জন সেশনজট মুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত এক সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ—এ ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা প্রতিশ্রুত।
লেখক :উপপরিচালক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ