রুরাল এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রুরাল ইকোনোমি

সংকটে বৈশ্বিক অর্থনীতি। ভূ-রাজনীতি আর পরিবেশ বিপর্যয়ে জীবন-জীবিকার শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার অবস্থায়। খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই ঝুঁকির মুখে। এক্ষেত্রে দরিদ্র দেশগুলোর সংকট মোকাবিলার জোর প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত মূলত কৃষিকে কেন্দ্র্র করেই। বিগত এক দশকে দেশের কৃষির সকল সেক্টর ‘শিল্প’ হিসেবে অর্থনীতিতে একটি গতির সঞ্চার করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কাটি প্রতিহত করার শক্তিটি বলা যায় কৃষি ও কৃষকেরই শক্তি। 

উৎপাদন অর্থনীতির মূল এ চালিকাশক্তিটি কি টেকসই? গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান উপজীব্য কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ। কৃষিজ উৎপাদন ছাড়াও অকৃষিজ কর্মকাণ্ডও উল্লেখযোগ্য। বাঁশ, বেত, নকশিকাঁথা, মাটির তৈরি শিল্পকর্ম—এসব ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আবহে এখনো প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। কোনটি ক্ষুদ্র পরিসরে প্রান্তিক পর্যায়ে আবার কোনটি মাঝারি পর্যায়ে। কৃষি ও অকৃষি দুইটিতেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে ‘উদ্যোক্তা’ তৈরির ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা যায় প্রযুক্তি ও পুঁজি দুটি বড় ফ্যাক্টর। সরকারি, এনজিও এবং কোম্পানি পর্যায়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিতরণ করার বিষয়টি লক্ষণীয়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে ঋণদান কর্মসূচিও বেশ গতিশীল। গত এক দশকে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে সফলতা অর্জিত হলেও গ্রাম পর্যায়ে উদ্যোক্তা সৃষ্টি বা কোনো শিল্প গড়ে না ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট। রপ্তানি পর্যায়ে কৃষিজ পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ এখন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নিরাপদ খাদ্যের চিন্তাধারায় উৎপাদন পর্যায়ের পাশাপাশি গ্রামেই এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। 

তবে বর্তমানে কৃষিজ উৎপাদন প্রযুক্তি ও উপকরণ সরবরাহে গ্রামের হাট-বাজারে সেবা ও পরামর্শ কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ ও পরামর্শের বিশ্বস্ত উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে। এইসব উদ্যোক্তা উচ্চতর প্রশিক্ষণ পেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠিত ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন’ রয়েছে যা এসএমই ফাউন্ডেশন নামে পরিচিত। এসএমই ফাউন্ডেশন ছাড়াও সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা পল্লি কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) শহর ও গ্রাম পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ঋণদান কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প চালু রেখেছে। বিগত কয়েক বছরে গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে একদিকে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। 

বর্তমানে গ্রামের মানুষের মধ্যে উচ্চশিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। চাকরির বাজার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গ্রামের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের উদ্যোক্তা তৈরির জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। ইদানীং গ্রামের মানুষের মধ্যে বিনোদন বা রিক্রেয়েশনের জন্য ভ্রমণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আর এ বিষয়টিকে চিন্তা করেই বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠছে মিনি ক্যাফে হাউজ। বলা যায় ‘গ্রামীণ পর্যটনশিল্প’ হিসেবে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে নতুন নতুন তরুণ উদ্যোক্তা। বদলে যেতে পারে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন ধারা। বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে দরিদ্র দেশগুলো। মহামারির পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাবে জীবন ও জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তবে সবার ওপরে যেখানে পেট সত্য, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ছাড়া মানবতা হতে পারে বিপন্ন। তাই বলা যায় কৃষি ও কৃষকই সত্য। বলা যায় কৃষি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। কৃষি ও কৃষকই আমাদের প্রাণ। উদ্যোগ আর উদ্যোক্তায় গ্রামই হয়ে উঠুক আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার রক্ষাকবচ।