দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হইতে বিশ্বে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে। তাহার মধ্যে দুই কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৬২ এবং ১৯৬৭ সালে ভারত-চীন যুদ্ধ, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইরাক-ইরান যুদ্ধ, ইসরাইল-আরব যুদ্ধ ছিল উল্লেখযোগ্য। এই সকল যুদ্ধ ছিল প্রধানত স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করিয়া, অথবা দুইটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইহা ছাড়া অসংখ্য সিভিল ওয়ার বা গৃহযুদ্ধ দেখা গিয়াছে। এই সকল যুদ্ধের পিছনে শক্তিশালী দেশ থাকলেও তাহার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়াইয়া পড়ে নাই। গালফ ওয়ার বা ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় জ্বালানি তৈলের মূল্য বাড়িলেও তাহা আবার স্বাভাবিক হইয়া গিয়াছে।
অধিকন্তু এই সকল যুদ্ধের সময় শান্তি আনিবার জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ সক্রিয় ছিল এবং যুদ্ধের নির্দিষ্ট সময় পর হয় চুক্তির মধ্য দিয়া অথবা যুদ্ধ বিরতির মধ্য দিয়া এই সকল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়াছে। অর্থাৎ মধ্যস্হতা করিবার মতো কেহ না কেহ ছিল; কিন্তু বর্তমান বিশ্বে যে পরিস্হিতি উপস্হিত হইয়াছে তাহা বিগত দিন হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতিমধ্যেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া সমগ্র বিশ্ব উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। এখন মধ্যস্হতা করিবারও কেহ নাই। যুদ্ধের পাশাপাশি এখন চলিতেছে এক দেশ আরেক দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রতিযোগিতা। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে, বৃদ্ধি পাইয়াছে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য। ফলে ধনী-দরিদ্র প্রতিটি দেশই বিশেষ সংকটে পড়িয়াছে। জ্বালানি তৈলের কিছুকাল অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় জাহাজ ভাড়া, পরিবহন ভাড়া বাড়িয়াছে অত্যধিক। ফলে খাদ্য ও অপরাপর পণ্যমূল্য দেশে দেশে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। উত্পাদনের সহিত যাহারা জড়িত, তাহারাও কোনো হিসাব মিলাইতে পারিতেছেন না। ইহার কারণে দেশে দেশে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হইতেছে। কোনো কোনো দেশে সাধারণ মানুষের উপর লাঠি চালাইয়াও পরিস্হিতি শান্ত করা যাইতেছে না। যেই সকল দেশে এখনো এই পরিস্হিতি শুরু হয় নাই তাহাদের ভাগ্য আপাতত কিছুটা ফেবার করিতেছে; কিন্তু তাহা কত দিন?
বর্তমান পরিস্হিতির সবচাইতে বড় আশঙ্কাজনক দিক হইল, অদূর ভবিষ্যতে পরিস্হিতি স্বাভাবিক হইবে তাহার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাইতেছে না। বরং মেঘ যেন আরো ঘনীভূত হইয়া আসিতেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই বুঝা গিয়াছিল তাইওয়ান প্রশ্নে আরো একটি উত্তেজনা যোগ হইতে যাইতেছে। এখন বিশ্বের বড় বড় দেশ কিছু ছোট দেশ লইয়া যুদ্ধের মহড়ার প্রতিযোগিতায় নামিয়াছে। ইহা ছাড়াও দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা, বসনিয়া সার্বিয়ার উত্তেজনা, ইসরাইল আরবের মধ্যে প্রায়শই সংঘর্ষ, সিরিয়া যুদ্ধ পরিস্হিতি দিনে দিনে আরো তীব্র আকার ধারণ করিতেছে। এই যে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ইহার কারণে ভুগিতে হইতেছে জনগণের। ইহার সহিত দেশে দেশে যেই দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ দেখা যায়, তাহা জীবনকে আরো দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছে। ইহার সহিত দুই বত্সরের কঠিন করোনা সংক্রান্ত ক্রাইসিস তো কাটিয়া যায় নাই। একবার চিন্তা করিয়া দেখা দরকার, বর্তমান পরিস্হিতিতে এই সকল দেশে জনগণ যদি ক্রোধ সংবরণ করিতে না পারে, যদি রুখিয়া দাঁড়ায় তাহা হইলে পরিস্হিতি কী হইতে পারে। এই সকল আশঙ্কা লইয়াই ভবিষ্যতে চলিতে হইবে, এই আশঙ্কা দায়িত্বশীলদের মাথায় রাখিতে হইবে। সকলকেই জানিতে হইবে, এখন জগত্টা এক কঠিন চোরাবালির মধ্যে পড়িয়াছে।