সততার এই সৌরভ ছড়াইয়া পড়ুক সবখানে

সততাই উত্তম পন্থা। ইংরাজিতে বলা হয়, অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। ইহা মানবচরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ হইলেও আমাদের সমাজে সততার বড়ই অভাব। অনেক সময় আমরা মুখে সততার কথা বলি। কিন্তু কাজকর্মে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এত কিছুর পরও আমাদের সমাজে কিছু সৎ ও সত্যবাদী মানুষ রহিয়াছেন। তাহাদের কারণে বাঁচিয়া রহিয়াছে সমাজ-সভ্যতা ও মানবতা। এই পৃথিবীতে বর্তমানে ভালো রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক, আইনজীবী, সাংবাদিক প্রভৃতি হইবার চাইতে ভালো মানুষ হওয়াটা সর্বাপেক্ষা জরুরি। ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়িলে সমাজ ও সংসার আলো ও শান্তিময় হইয়া উঠিবে। কিন্তু মানবসমাজের নিরাপত্তা, সুখ-শান্তি ও উন্নতির জন্য প্রত্যেক মানুষের জীবনে সততার প্রয়োজনীয়তা যে অপরিসীম তাহা আমরা বলিতে গেলে ভুলিতে বসিয়াছি। তবে মাঝেমধ্যে এমন সকল খবর প্রকাশিত হয়, যাহা বাংলাদেশিদের সততায় আমরা মুগ্ধ না হইয়া পারি না। সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা ঘটিয়াছে ঠাকুরগাঁওয়ে। সেখানে ক্রোকারিজের ব্যবসায়ী এক যুবক সৌরভ রাস্তায় ৫ লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ কুড়াইয়া পান। অগত্যা তিনি তাহার মালিককে খুঁজিয়া না পাইয়া শহর জুড়িয়া মাইকিং করেন এবং যথাবিহিত অবহিত করেন থানার পুলিশকে। তাহার এই সততার বিষয়টি লইয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন তুমুল আলোচনা চলিতেছে। প্রশংসায় ভাসিতেছেন সেই যুবক। আমরা চাই, সততার এই সৌরভ ছড়াইয়া পড়~ক সবখানে।

এইখানে টাকা কুড়াইয়া পাইয়া ফেরত দেওয়ার ঘটনাটি নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যাইতে পারে। প্রধানত সততার জন্যই ভালো মানুষ সেই অর্থ ফিরাইয়া দেন। নিজের পরিশ্রমে যাহা অর্জিত নহে এবং যাহা অন্যের সম্পদ, তাহার প্রতি সৎ লোকেরা বরাবরই অনাসক্ত থাকেন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি হইতে সততার শিক্ষালাভের কারণে তাহারা এমন মহৎ কাজ করিয়া থাকেন। তবে এমন প্রবণতা খুবই কম। কারণ আমাদের সমাজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাইয়া গিয়াছে যে, সিস্টেম বা পদ্ধতিগত কারণেই মানুষ অনেক সময় চাহিলেও সৎ থাকিতে পারেন না। চারিপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে সততার পরিচয়ও দিতে পারেন না। আবার একসঙ্গে অনেক টাকা কেহ কুড়াইয়া পাইলে তাহা বিপদ হইতে পারে ভাবিয়াও অনেকে তাহার মালিককে ফেরত দিতে পারেন। কেননা ইহাতে অনেক সময় মামলা-মোকদ্দমার ভয় থাকে, থাকে দুদক ও এনবিআরের তরফ হইতে উটকো ঝামেলায় পড়িবার আশঙ্কা। তবে টাকা ফেরত দানের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সততাটাকেই মানুষ বড় করিয়া দেখিয়া থাকেন এবং প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। অনেক গরিব ব্যক্তিকেও এই ক্ষেত্রে নির্লোভ থাকিতে দেখা যায়। তাহারা এমনকি কোনো পুরস্কার বা প্রতিদানও চাহেন না। শুধু দেশেই নহে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে এইরূপ সততার নানা অনুপম ঘটনা হরহামেশাই ঘটিতেছে। একবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে কার ওয়াশ কোম্পানির মালিক মুহাম্মদ মহসিন সুমন তাহার কোম্পানিতে আসা একটি গাড়ির সিটের নিচে প্রায় ২৪ লক্ষ আমিরাতি মুদ্রা পাইয়াও তাহা তাহার প্রকৃত মালিককে খুঁজিয়া ফিরাইয়া দিয়াছেন। সেই সময় তিনি মন্তব্য করিয়াছিলেন, ২৪ লক্ষ কেন, ২৪ কোটি দিরহাম পাইলেও তিনি তাহা ফিরাইয়া দিতেন।

আমরা জানি, সততার মহান পুরস্কার স্বর্গ ব্যতীত আর কিছুই নহে। এই জন্য ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ যাবতীয় লেনদেনে সততার পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। সর্বদা সততা ও সত্যতা অবলম্বন করাই আমাদের কর্তব্য। ইহাই আমাদের জীবনের সৌন্দর্য ও সম্মানের প্রতীক। কেহ যতই শিক্ষিত হউন না কেন, সততা ছাড়া তাহার প্রতি আস্থা রাখা যায় না। দেশে যেই হারে জালিয়াত চক্র, কালোবাজারি, অবৈধ মুনাফাখোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, অর্থ পাচারকারী ও অসাধু লোকের সংখ্যা বাড়িতেছে, সেখানে এই সততার গুণটি আমাদের নিকট ক্রমেই মহামূল্যবান হইয়া উঠিতেছে।