পুলিশ শব্দের প্রথম ‘পি’ অক্ষরের অর্থ হইল পিস—অর্থাৎ শান্তি। শিল্পোন্নত দেশে ইহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য; কিন্তু এই উপমহাদেশের জনমানসে পুলিশ বহুকাল ধরিয়া বহু ক্ষেত্রেই মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। প্রথাগত ভীতি এইরূপ যে, বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা। বলিবার অপেক্ষা রাখে না—সরিষার মধ্যে ভূত থাকিলে ভূত তাড়ানো দূরে থাকুক, উহারা ঝাড়ে-বংশে আরো বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় রুম্মন নামের এক যুবকের মৃত্যু পত্রপত্রিকায় গুরুত্বের সহিত আলোচিত হইয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, যুবকের পরিবার অভিযোগ করিয়াছে যে, ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা চাহিয়াছিল পুলিশ, তাহা দিতে না পারায় ঐ যুবককে পিটাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। পুলিশ অবশ্য বলিয়াছে, গত শুক্রবার রাত ৩টা ৩২ মিনিটে রুম্মন তাহার পরনের ট্রাউজারের রশি দিয়া লোহার গ্রিলের সহিত গলায় ফাঁস দিয়াছেন, যাহা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়াছে।
তবে কথা হইল, পুলিশ বলিয়া যাহা খুশি তাহা করিয়াও পার পাইয়া যাইবে—সেই অরাজক অবস্থা চিরদিন থাকিবে না নিশ্চয়ই। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ২০১৩ সালে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইন প্রণয়ন করিয়াছে। সেই আইনে ইতিপূর্বে কয়েক জন পুলিশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। সুতরাং দেশে আইন আছে এবং আইন চলিবে আইনের পথে। পুলিশ হেফাজতে রুম্মনকে নির্যাতন করা হইয়াছে কি না এবং সেই নির্যাতনের কারণেই তাহার মৃত্যু হইয়াছে কি না—ইহার মীমাংসা ও বিচার আদালতই করিবে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, রাত সাড়ে ৩টায় রুম্মন ফাঁসি দিতে চাহিল, তাহা সিসিটিভিতে দেখাও গেল, অথচ পুলিশ তাহা ঠেকাইল না, কিংবা সেই দিকে পুলিশের দায়িত্বশীল ব্যক্তির কোনো খেয়ালই থাকিল না—ইহা কি অনেক বড় দায়িত্ব অবহেলা নহে?
বিভিন্ন সময় পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তা গণমাধ্যমে আশা ব্যক্ত করিয়াছেন যে, বিশ্বে রোল মডেল হইবে বাংলাদেশ পুলিশ। অসৎ কোনো কর্মকর্তা এই বাহিনীতে থাকিতে পারিবেন না। সৎ কর্মকর্তারাই টিকিয়া থাকিবেন। অনিয়মের সহিত জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইবার কথাও আমরা বিভিন্ন সময় শুনিয়াছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও প্রায়শই দেশের সকল ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ সদস্যদের আরো আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাইয়া থাকেন; কিন্তু সাধারণ জনগণের নিকট পুলিশের নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয়চিত্র কতখানি স্পষ্ট? নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য। উন্নত বিশ্বে আইনের শাসন নিশ্চিত করিতে পুলিশের বিকল্প নাই। ইহা ঠিক যে, বর্তমানে থানায় গিয়া অতীতের তুলনায় পুলিশের নিকট হইতে অনেক অধিক বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পায় সাধারণ জনগণ। রহিয়াছে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯। সেইখানেও অসাধারণ অনেক পুলিশি সেবার ঘটনা আমরা দেখিতে পাই; কিন্তু তাহার পরও পুলিশি হেফাজতে অত্যাচার, জুলুম, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অনেক ঘটনা প্রতিনিয়তই সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়।
এমনিতেই বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বাড়িয়াছে। সামনে আরো খারাপ দিন আসিতে পারে। সমগ্র দেশেই কমবেশি দ্বন্দ্ব-সংঘাত সংঘর্ষ হত্যা নৃশংসতা জিঘাংসা বৃদ্ধি পাইতে পারে। বিশ্বব্যাপী অস্হিরতার ঢেউ আমাদের কতদিকে কতভাবে আঘাত করিবে, আমাদের কোথায় লইয়া যাইবে—তাহা আমরা কেহই স্পষ্ট করিয়া জানি না। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার মান হ্রাস, নূতন চাকুরির বাজার সৃষ্টি না হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অবনতির ক্রমধাবমান অবস্থার রক্তচাপ সাধারণ মানুষের ভিতরে ব্যাপকমাত্রায় বাড়িতেছে। সুতরাং এই সময় পুলিশকে আরো সতকর্তার সহিত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করিতে হইবে। শুধু পুলিশ বাহিনী নহে, সকল ক্ষেত্রেই সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বুদ্ধিমত্তার সহিত স্ব স্ব কর্তব্য পালনসহ অধিক ধৈর্যের পরিচয় দিতে হইবে।