নিষেধাজ্ঞার যুদ্ধে কে জিতছে?

রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, তার ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি চরমভাবে বেকায়দায় পড়ে যাবে। ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর আগ্রাসনের সম্ভাবনা সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আপনার অর্থনীতি ‘ধ্বংসাত্মক’ পরিণতির মুখোমুখি হবে। তবে বাইডেনের কথাকে পাত্তা দেননি পুতিন। ইউক্রেনকে আক্রমণ করে বসেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার ওপর যেসব ‘কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করা হয়, তাতে করে রাশিয়ার অর্থনীতি বাস্তবিক অর্থেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়। তবে এর পরেও পুতিন তার পথ থেকে সরে আসেননি। তিনি চালিয়ে যান ‘জিউজিত্সু (সামরিক অভিযান ও স্থলযুদ্ধ)’। এবং একই সঙ্গে তিনিও আরোপ করেন ‘পালটা নিষেধাজ্ঞা’। এভাবে উভয় পক্ষের রেষারেষিতে যুদ্ধ সামনে গড়াতে থাকে। 

গত ২৪ আগস্ট ইউক্রেন যুদ্ধ অর্ধবার্ষিক কাল অতিক্রম করেছে। এখন পর্যন্ত চলমান যুদ্ধে তিনটি পর্যায় লক্ষ করা গেছে। প্রথমে বাধা-প্রতিরোধ; তারপর শক্তি-ক্ষমতা প্রদর্শনের হুমকির মাধ্যমে নিবৃত্ত করার চেষ্টা এবং সর্বশেষ উভয় পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাবনিকাশ—‘নিষেধাজ্ঞাযুদ্ধে’ আসলে জিতছে কে?’

প্রাথমিক পর্যায়ে বাধা প্রদান তথা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ‘নিষেধাজ্ঞা’ কাজে দেয়নি ততটা। পুতিনের ‘বৃহত্তর রাশিয়া দৃষ্টিভঙ্গি’ ও ‘বিজয় খুবই নিকটবর্তী’ বিশ্বাস তাকে খুবই অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। লক্ষণীয় যে, রাশিয়ান সৈন্যরা সঙ্গে করে ব্যাগভর্তি প্যারেড ইউনিফর্ম নিয়েছিল। অর্থাৎ, বৃহৎ পরিসরে যুদ্ধ বাধানোই তাদের চূড়ান্ত টার্গেট ছিল। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ বাধানো পুতিনের টার্গেটে না থাকলেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি তার পলিসি সীমিত করতে বাধ্য করে। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার হুমকি কিছুটা হলেও সফল হয় বলা চলে। ব্যাপক-সর্বাত্মক যুদ্ধে যাওয়ার দৃঢ় আগ্রাসী মনোভাবকে আটকানো সম্ভব হয়। অতীতে ঠিক এরকমটাই দেখা যায় ইতালীয় সাবেক স্বৈরশাসক বেনিটো মুসোলিনির ১৯৩৫ সালে ইথিওপিয়া-অ্যাবিসিনিয়া আক্রমণ করার সময়, ১৯৯০ সালে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের বেলায় এবং ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণের ক্ষেত্রে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে রাশিয়ান বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের সুবিধার্থে ন্যাটোর সমর্থনে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় রাশিয়ার ওপর, যাতে করে পুতিনকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করা যায়। এই পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়াকে চরমভাবে মুশকিলে ফেলে দেয়। আর্থিক নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়—হার্ড কারেন্সি রিজার্ভে (স্থিতিশীল মুদ্রা, যা পণ্যসেবার মূল্য পরিশোধে সহজে ব্যবহারযোগ্য) থাকা ৬৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রায় অর্ধেক ফ্রিজ (ব্যবহার-অযোগ্য) অবস্থায় রয়েছে এখনো। সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং সেলফোন ও গাড়ির মতো বাণিজ্যিক পণ্য নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। ১ হাজারের বেশি বহুজাতিক কোম্পানি রাশিয়ায় কিংবা দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয় অথবা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। পুতিন ও তার পরিবারসহ ছয় শতাধিক রাশিয়ান ধনকুবের ও অভিজাত ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। ফিফা বিশ্বকাপ (পুরুষ ও মহিলা উভয়), আন্তর্জাতিক আইস হকি ফেডারেশন, ফর্মুলা-১ ও ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা তথা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা সাধারণ রাশিয়ানদের বিচ্ছিন্ন করে তাদের মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রাশিয়ান অর্থনীতির জন্য বিশেষ কৌশলগত ভূমিকা রাখে। এ দুটি খাতের যুদ্ধ-পূর্ব উৎপাদন ফেডারেল বাজেটে প্রায় অর্ধেক এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর এই খাতদ্বয়ের উৎপাদন ধীরগতির হয়ে যায়। উপরন্তু নিষেধাজ্ঞা আরোপকারীদের তথা পশিচমা বিশ্বের ‘রাশিয়ার জ্বালানিনির্ভর’ হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া উৎপাদন সীমিত করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৯০ সালের পর সবচেয়ে বাজেভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে রাশিয়ান জিডিপি। গত মার্চ মাসে রুবল মূল্য হারিয়েছে প্রায় অর্ধেক। প্রতি ডলারের বিপরীতে রুবল গিয়ে ঠেকেছে ১৫৪তে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে মস্কোর মেয়র সতর্ক করে বলেছিলেন, ২ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরশীল সেক্টরগুলোতে এই হার আরো অনেক বেশি। ইউক্রেনীয় প্রতিরোধযুদ্ধের ফলে বহু সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ার ফলে এবং আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনঃআরোপের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার (যেহেতু রাশিয়া জ্বালানি অবরোধ আরোপ করে পশ্চিমাকে রুখতে চেয়েছিল, যাতে নতুন করে অবরোধ আরোপ করা থেকে পিছিয়ে আসে পশ্চিমা বিশ্ব) চেষ্টার কারণে রাশিয়ার বিপত্তি আরো বৃদ্ধি পায়—রাশিয়ান ফ্রন্টলাইন বাহিনী অভাব, দুষ্প্রাপ্যতার মুখোমুখি হয়।

বস্তুত, নিষেধাজ্ঞা আরোপিত দেশগুলো কিছু পালটা ব্যবস্থা অবলম্বন করে। রাশিয়াও সেই পথ ধরেই হেঁটেছে। এক্ষেত্রে তিনটি প্রধান নিষেধাজ্ঞা প্রতিরক্ষা কৌশল অবলম্বন করে রাশিয়া—বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার, স্যাংশন বাস্টিং (নিষেধাজ্ঞাকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা) এবং ডমিস্টিক অফসেট (পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। একে সংক্ষেপে ‘ডিও’ বলা হয়)।

যদিও অনেক দেশ নিষেধাজ্ঞায় যোগ দিয়েছে; তবে কিছু বড় দেশ (‘কি’ কান্ট্রি) তা করেনি। রাশিয়ান তেল আমদানি বাড়িয়েছে চীন। দেশটি সামরিক পণ্য সরবরাহ বাড়িয়েছে। দিয়েছে সমর্থনমূলক বিবৃতি। মূল্যছাড়ের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্কের কারণে রাশিয়ার তেল আমদানি ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করেছে ভারত। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উৎপাদন বাড়াতে অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে, বৈশ্বিক মূল্য বেড়েছে, যদিও ছাড় দিয়েছিল রাশিয়া।

শিপার ও রিফাইনাররা রাশিয়ান তেল নিয়ে অনিয়মের আশ্রয় নেয়। হাজার হাজার মেট্রিক টন ইউক্রেনীয় শস্য চুরি করা হয় এবং সেগুলো পাঠানো হয় রাশিয়ান মিত্রদের কাছে। ধনকুবের এবং পুতিনের অভিজাত বন্ধুরা তাদের সুপারইয়াটগুলোর (বিলাসবহুল প্রমোদতরি) জন্য অফশোর ট্যাক্স ও ব্যাংকিং হেভেন এবং নিরাপদ আশ্রয় খোঁজাসহ আরো নানা উপায়ে অনেক নিষেধাজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে।

বিপত্তি বেড়েই চলেছে রাশিয়ার। ক্রেমলিন অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণমূলক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি করেছে। এসব অবশ্য রুবলকে জুনের শেষের দিকে সাত বছরের সর্বোচ্চ পতন থেকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধি ও কোম্পানির বেলআউট রাশিয়ার সাধারণ জনগণকে সাহায্য করেছে যদিও; তবে প্রতিবাদের প্রাথমিক ঢেউকে আছড়ে পড়া থেকে ঠেকাতে অভ্যন্তরীণ গ্রেফতার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালায় রাশিয়া। কিছু ধনকুবের ও এলিট শ্রেণি, যারা কথা বলার সাহস দেখিয়েছে, তাদের মূল্য চোকাতে হয়েছে।

আমরা এখন আছি তৃতীয় পর্যায়ে। এই পর্যায়ের মূলকথা হলো—কে কতটা ধরাশায়ী? দেখা গেছে, পালটা নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাশিয়া। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া। ৩১ জুলাই পর্যন্ত পাইপলাইনে দৈনিক গ্যাসের পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ঘনমিটারে নেমে এসেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি। জার্মানিতে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে—প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ২৬০ ইউরো। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বড় শিল্পগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। জ্বালানি সংরক্ষণের পাশাপাশি ভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ার ফলে বিপত্তি যদিও কমেছে কিছুটা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাম্প্রতিক গ্যাস-বণ্টন চুক্তিতে শীতকালীন রেশনিংয়ে (পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া) কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, কিছু রেশনিং ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম গ্রীষ্মের মধ্যেও স্পেনে বাণিজ্যিক এয়ারকন্ডিশনার ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) নিচে চালাতে নিষেধ করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে পাঁচ মিনিটের মধ্যে শাওয়ার (গোসল) শেষ করতে উত্সাহিত করা হয়েছে। ফ্রান্সে ‘শহুরে গেরিলা’ হিসেবে আখ্যায়িত দোকান ও বিপণিবিতানগুলোর সামনের দরজার আলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।

লেখক : ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের (নর্থ ক্যারোলিনা, যুক্তরাষ্ট্র) অধ্যাপক এবং উইলসন সেন্টার ও শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফেলো

ফরেন পলিসি থেকে ভাষান্তর : সুমৃৎ খান সুজন