সাইবার হামলা: অভিজ্ঞতার আলোকে নজর রাখুন

একসময় মানুষ ছিল অসহায়। তাহার হস্তে এক টুকরা লাঠিও ছিল না। কারণ সে লাঠির ব্যবহারও জানিত না। সেই মানুষ লাঠি হইতে পরমাণু শক্তি পর্যন্ত উন্নীত হইয়াছে। মাধ্যাকর্ষণ পার হইয়া চাঁদের পিঠে অবতরণ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, স্পর্শ করিয়াছে ১৫ কোটি মাইল দূরতের মঙ্গল গ্রহ। ইহার সহিত ইন্টারনেট প্রযুক্তিতেও অভাবনীয় গতিতে অগ্রসর হইয়াছে পৃথিবীর মানুষ; কিন্তু ইহার পাশাপাশি এই মানুষই হাতে লাঠি বা পাথর তুলিয়া লইবার ক্ষণ হইতেই তাহার অপব্যবহার করিতে শুরু করিয়াছিল, লিপ্ত হইয়াছিল সংঘর্ষ, সংঘাতে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে যত অগ্রসর হইয়াছে, সংঘাত সংঘর্ষ, অন্যের সঙ্গে লড়াই করিবার ‘শিল্প’কেও তাহারা সমান তালে আগাইয়া লইয়াছে।
 
ইন্টারনেটের অগ্রগতির পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট একটি অনুষঙ্গ হইতেছে সাইবার। কম্পিউটার ইনফরমেশন সিস্টেমস, কম্পিউটার নেটওয়ার্কস এবং কম্পিউটার ইনফ্রাস্ট্রাকচার অথবা পারসোনাল কম্পিউটার ডিভাইস ধ্বংস করিবার, ক্ষতিগ্রস্ত করিবার এক হাতিয়ার বা অস্ত্র হইল সাইবার অ্যাটাক। বর্তমান ইন্টারনেট-ভিত্তিক পৃথিবীতে একটি ব্যক্তিগত কম্পিউটারে স্পাইওয়ার হইতে শুরু করিয়া ভাইরাস ব্যবহার হইতে শুরু করিয়া একটি জাতির অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংস করিয়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এই সাইবার আক্রমণ। এই সাইবার হামলা করিয়া থাকে যাহারা তাহাদেরকে সাধারণ ভাষায় বলা হইয়া থাকে হ্যাকার। এই হ্যাকাররা অপরাধী জগতের হইলেও বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা হইল, বড় বড় কুখ্যাত হ্যাকারদের বিভিন্ন দেশের সরকার নিজেদের খরচে পুষিয়া থাকে। 

আবার নিজেদের বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা করিতে হয় অন্যের আক্রমণ হইতে নিরাপদে থাকিবার জন্য। ঠিক যেন ভার্চুয়াল অস্ত্র। আমরা হামেশাই দেখিতে পাইতেছি বৈরী দেশগুলি পরস্পর সাইবার আক্রমণ করিতেছে, একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করিতেছে। বর্তমানে যুদ্ধরত রাশিয়া ও ইউক্রেন বারবার অভিযোগ করিতেছে সাইবার আক্রমণের। এই আক্রমণ সর্বদা সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় ঘটে না। ব্যক্তিগত সাইবার অপরাধীরাও ইহা ঘটাইয়া থাকে। এমনকি অযথাও অনেক ভালনারবল সাইট আক্রমণের শিকার হয়। এই হামলা কিন্তু প্রায় সর্বক্ষণই ঘটিতেছে। ইহা অনেকটা ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনীয়। রিখটার স্কেলে তিনের নিচের মাত্রার ভূমিকম্প সচরাচর হইতেছে যাহা মানুষ বুঝিতে পারে না; কিন্তু পাঁচ হইতে আট মাত্রায় উঠিলে তাহা মানুষকে বিচলিত করিয়া তোলে। কোথাও কোথাও ধ্বংস করিয়া ফালায়।

এই সাইবার আক্রমণের মধ্য দিয়া বিভিন্ন দেশের অর্থ হাতাইয়া লইবার বহু উদাহরণ আছে। ইহার মধ্যে অন্যতম দুর্ভাগ্যজনক হামলার শিকার হইয়াছিল বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্র‚য়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বাংলাদেশ অ্যাকাউন্ট হইতে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করিয়া ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় লইয়া যাওয়া হইয়াছিল বাংলাদেশের সিস্টেমকে সাময়িকভাবে অচল করিয়া। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিরক্ষাব্যবস্হা পূর্বেই ছিল; কিন্তু যে করিয়াই হউক তাহা ভাঙিয়াছিল হ্যাকাররা। তাহার পর হইতে কতৃ‌র্পক্ষ আরো সতর্ক হইলেও সাইবার হামলায় ক্ষতি যে হইবে না, তাহা এখনো নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। গত বুধবার ইত্তেফাকের এক রিপোর্টে জানানো হইয়াছে, বাংলাদেশ সাইবার হামলার ঝঁুকিতে রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া বিদু্যত্, টেলিকম ও আর্থিক খাত অধিক ঝুঁকিতে। দেশের সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষ জানাইয়াছে, বিশ্বের যেই ১০টি দেশে র্যানসামওয়ার ট্রোজান (ইহাকে গুলির সঙ্গে তুলনা করা যাইতে পারে) হামলা অধিক হইতেছে তাহার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম! বর্তমান বিশ্বে বন্ধুর যেমন অভাব নাই, তেমনি শত্রুরও অভাব নাই—এই কথা সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষকে মাথায় রাখিয়া সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখিতে হইবে। কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠান নহে, দেশের প্রাইভেট কোম্পানিগুলি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। হ্যাকারদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও সাইবার গোয়েন্দা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের নিয়মিত খোঁজ রাখিতে হইবে। কারণ একবার ক্ষতি হইয়া গেলে তাহার পরিণতি কী হয়, সেই সম্পর্কে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আছে।