বাংলাদেশে স্পেস রোবটিক্স সম্প্রসারণ এবং রোবটিক্স সংক্রান্ত জ্ঞান উন্নীতকরণের লক্ষ্যে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর একঝাঁক মেধাবী শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে গঠিত দল 'ইন্টারপ্ল্যানেটার'। মূলত রোবটিক্সের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে এবং স্পেস রোবটিক্সের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতেই ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় 'টিম ইন্টারপ্ল্যানেটার'।
বর্তমানে দলটির সদস্য সংখ্যা ৪০। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যেসব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়, তার উপর ভিত্তি করে সমগ্র দলটিকে সর্বমোট ৫টি উপদলে বিভক্ত করা হয়েছে। যান্ত্রিক নকশা ও যন্ত্র নির্মাণ উপদল, তড়িৎ প্রকৌশল উপদল, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও সফটওয়্যার নির্মাণ উপদল, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপদল, তথ্য ও প্রচার উপদলের সমন্বিত প্রয়াসেই মূলত ইন্টারপ্ল্যানেটার এর সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দলে থাকা যান্ত্রিক নকশা ও যন্ত্র নির্মাণ উপদলের ওপরই মূলত দৃশ্যমান রোভারটি তৈরি করার গুরুদায়িত্ব বর্তায়। প্রতিযোগিতার জন্য প্রথমেই কোনো একটি ত্রিমাত্রিক নকশা সংক্রান্ত সফটওয়ার, যেমন: সলিডওয়ার্কস, ফিউশন ৩৬০ ডিগ্রির মাধ্যমে পুরো রোভারটির ডিজাইন করা হয়। কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে নকশা চূড়ান্তকরণের পর শুরু হয় মূল রোভার তৈরির কাজ। যন্ত্র নির্মাণ উপদল ধারাবাহিকভাবে রোভারের চেসিস, চাকা, সাসপেনশন সিস্টেম ও রোবটিক হাত নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে। তাদের তৈরি বর্তমান রোভারটি বানাতে সময় লেগেছে প্রায় ১ বছর।
পুরো রোভারটিকে সচল করতে এবং প্রতিযোগিতার বিভিন্ন কার্যক্রম সুচারুরুপে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নির্মাণকল্পে উপযুক্ত বর্তনীর ও পিসিবি'র নকশা করে থাকে তড়িৎ প্রকৌশল উপদল। রোভার নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন নির্দেশ পাঠানোর কাজটি করানোর দায়িত্ব থাকে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও সফটওয়্যার নির্মাণ উপদলের উপর। প্রতিকূল পথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো, রোভার এর হাত দিয়ে বিভিন্ন কাজ করা সহ সকল কাজেই বিভিন্ন সফটওয়্যার ইন্টারফেস ব্যবহার করা হয়। এ কাজগুলো মূলত রোবট অপারেটিং সিস্টেম (আরওএস) দ্বারা সম্পাদন করা হয়।
মার্স রোভার ভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোর একটা বড় অংশই থাকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ভিত্তিক। কাজটি করে থাকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপদল। দলটি মূলত মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের অনুরুপ পরিবেশে মাটির গুনাগুণ, বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির প্রকৃতি, জীবাশ্ম এর উপস্থিতি এসব বিশ্লেষণ করে থাকে। তথ্য ও প্রচার উপদলের কাজ মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবস্থাপনা, প্রতিবেদন প্রস্তুতি, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশন করা। তাদের এই তৎপরতার ফলে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই অনেকগুলো সফল আয়োজন সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছে।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারও তারা ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (ইআরসি)-এ অংশ নিয়েছে এবং সাফল্যের সাথে প্রাথমিক পর্বে উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। ইআরসি একটি আন্তর্জাতিক স্পেস-রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা যেখানে মহাকাশ প্রযুক্তিতে আগ্রহী বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রস্তুতকৃত রোভার নিয়ে অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতাটির চুড়ান্ত পর্ব এ বছরের সেপ্টেম্বরে পোল্যাণ্ড এ অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্রতিষ্ঠিত দলগুলোর মধ্যে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার এই অনন্য সুযোগ বাংলাদেশে স্পেস রোবটিক্সের অগ্রযাত্রাকে আরও শাণিত করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।