নৌবন্দরের নাব্যসংকট

যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বন্দরের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌবন্দরের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক; কিন্তু নৌবন্দর ও নৌপথের একটি বড় সমস্যা হইল নাব্যসংকট। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায়, তীব্র নাব্যসংকটের কারণে যশোরের নওয়াপাড়া নৌবন্দরের কার্যক্রম স্থবির হইয়া পড়িয়াছে। এখানে পণ্য উঠানামা ব্যাহত হইতেছে মারাত্মকভাবে। এই বন্দরের আটটি জেটি ও একটি পন্টুন বর্তমানে নদীর তীর হইতে অনেক দূরে অবস্থান করিতেছে। ইহাতে পণ্য খালাসে শ্রমিক খরচ ও সময় অধিক ব্যয় হইতেছে। জোয়ারের সময়ও লাইটার জাহাজগুলি ঘাটে ভিড়িতে পারিতেছে না। কখনো কখনো পণ্য খালাসে এক মাসও লাগিয়া যায়। ইহাতে ব্যবসায়ীদের জাহাজের ডেমারেজ গুনিতে হয়, যাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উপর।

শুধু নওয়াপাড়া নৌবন্দর নহে, অন্যান্য নৌবন্দরের নাব্যসংকটও এই বন্দরগুলির কার্যক্রম গতিশীল করিবার অন্তরায় হিসাবে বিবেচিত হইতেছে। নদীর দুই পার্শ্ব ভরাট হইয়া যাওয়া, কিছু কিছু ব্রিজের স্প্যানের প্রভাবে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি কারণে নৌবন্দরগুলি ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দরেও বিদ্যমান অনুরূপ সমস্যা। এখানে যমুনা নদীর বুকে জাগিয়া উঠা অসংখ্য ডুবোচরের কারণে আটকা পড়িতেছে জাহাজ। ইজারাদারদের নির্মাণকৃত অস্থায়ী বাঁশের চাটাই ও তক্তা দ্বারা তৈরি পাটাতন দিয়া শ্রমিকরা জাহাজ হইতে পণ্য খালাস করিতেছে ঝুঁকিপূর্ণভাবে। বিআইডব্লিউটিএ কতৃ‌র্পক্ষ বলিতেছে, প্রতি বৎসর পাহাড়ি ও বন্যার পানির ঢলে প্রচুর পলি আসিয়া জমা হয় নদনদীতে। অনেক সময় পলি অপসারণ করিয়া তাহা ফেলিবার জায়গাও থাকে না। তাহারা যে অজুহাতই দেন না কেন, স্থায়ীভাবে নদীর নাব্য ফিরাইতে ব্যর্থ হইলে আমাদের মোংলা ও সম্ভাবনাময় পায়রা সমুদ্রবন্দরও একদিন হুমকির মুখে পড়িবে। ব্যবসায়ীদের দাবি, নৌবন্দর ব্যবহার করিয়া কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হইলেও শেড, গুদাম নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় তাহারা তেমন কোনো সুবিধাই পাইতেছেন না। এই রূপ উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বন্দরগুলি সচল রাখিবার জন্য ব্যাপক ভিত্তিতে ও কার্যকর পদ্ধতিতে ড্রেজিং কার্যক্রম ও গাইডওয়াল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।

আমাদের দেশের বন্দরের সমস্যা দেখিবার জন্য কনসালট্যান্ট, টেকনিশিয়ান এমনকি ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পদধারী ব্যক্তি রহিয়াছেন; কিন্তু তাহারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিলেও এই সমস্যাগুলি দেখভাল করিবার ক্ষেত্রে যেন উদাসীন। এই ধরনের সমস্যার সমাধান করিতে হইলে অনেক সময় একক মন্ত্রণালয় দ্বারা সম্ভবপর হয় না। এই জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলির সমন্বিত উদ্যোগ ও ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আমরা জানি, দেশে নদী গবেষণারও ব্যবস্থা রহিয়াছে। সেই সকল গবেষকের পরামর্শের ভিত্তিতে নৌবন্দরের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হইবার কথা নহে। প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ নওয়াপাড়া নৌবন্দরটি ব্যবহার করিয়া সার, সিমেন্ট, কয়লা, গমসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়। বর্তমানে প্রতি বৎসর ৪ হাজারেরও অধিক জাহাজে ২০ লক্ষ টনের অধিক পণ্য আসিতেছে এই বন্দরে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে বড় জাহাজ হইতে খালাসের পর তাহা ছোট বার্জ ও কার্গোতে করিয়া নদীপথে নওয়াপাড়া বন্দরে আনয়ন করা হয়। আবার ভারত হইতে স্থলপথে যেই সকল পণ্য আমদানি করা হয়, তাহার অধিকাংশ রেলের ওয়াগনে দর্শনা স্থলবন্দর হইয়া নওয়াপাড়ায় আনা হয়। অতএব, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দরের রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা মোটেও কাম্য নহে। কালভার্ট নির্মাণ করিলেও তো তাহা নিয়মিত মেইনটেইন করিতে হয়। তাহা হইলে লাভজনক নৌবন্দরের ক্ষেত্রে কেন নিয়মিত ড্রেজিং, নদীশাসন ও ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্হা গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হইবে না? নদী সম্পদ রক্ষায় আমাদের নদীগুলির নাব্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রতি মনোনিবেশ করিতে হইবে।