অপচয় ও অনিয়ম হইল একটি রাষ্ট্রের জন্য ঘুণ পোকা

কথায় আছে—‘সরকারি মাল, দরিয়ামে ঢাল’। যুগ যুগ ধরিয়া লোকসমাজে প্রচলিত এই প্রবাদটি এখনো আমাদের দেশের জন্য নিদারুণভাবে প্রাসঙ্গিক। ইহার প্রমাণ রাষ্ট্রের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই কমবেশি পাওয়া যাইবে। বিমান, বিজেএমসি, বিসিআইসি, বিএফআইডিসি, বিটিএমসি, ঢাকা ওয়াসা, বিআরটিসি, টিসিবি, বিএফডিসি, বিআইডব্লিউটিএ, সওজ, চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন প্রভৃতি সংস্থার সমস্যার কথা তো প্রায়শই পত্রপত্রিকার পাতায় শতসহস্র শব্দে-বাক্যে বর্ণিত হয়। এইবার আমরা রেলের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি।

একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন বলিতেছে, রেলে প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেনে আসনসংখ্যার বিপরীতে ৬৯ শতাংশ টিকিট বিক্রয় হয়, অবিক্রীত থাকে ৩১ শতাংশ। আর লোকাল মেইল ও কমিউটার ট্রেনে আসনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়। অথচ কোনো ট্রেনের একটি আসনও খালি থাকে না। উলটো কামরার ভিতরে এবং কখনো কখনো ছাদে, ইঞ্জিনের উভয় পাশেও ঝুলিয়া ঝুলিয়া গন্তব্যে পৌঁছান যাত্রীরা। 

প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন আসনসংখ্যার বিপরীতে ১ লক্ষ ৪ হাজার ৮০ জন যাত্রী বিনা টিকিটে রেলভ্রমণ করিতেছেন। অঙ্কের হিসাবে এই হার ৫৯ শতাংশ। বলা হইতেছে, সক্ষমতার অভাবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ইহার সুরাহা করিতে পারিতেছে না। ১৫ বৎসর পূর্বেই রেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা রহিত হইয়াছে। অন্যদিকে টিকিট পরিদর্শকের ৭৩ শতাংশ পদ শূন্য রহিয়াছে। ফলে শতভাগ যাত্রীকে চেকের আওতায় আনা যাইতেছে না। তাহা ছাড়া দেশের ৪৮৪টি স্টেশনের মধ্যে মাত্র সাতটিতে নিরাপত্তাবেষ্টনী রহিয়াছে, বাকিগুলি উন্মুক্ত। ফলে এই সকল স্টেশন হইতে বিনা টিকিটের যাত্রীরা বাধাহীনভাবে চলাচল করিতেছেন।

রেল একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। আমরা বহু বৎসর ধরিয়া দেখিতেছি, সরকারি সংস্থাগুলি বিভিন্ন কারণে লোকসান দিতেছে, অপচয় ও অনিয়মের স্তূপ জমিতেছে। পদ্ধতিগত অপচয়, দুর্ঘটনাজনিত অপচয়সহ কোন কোন খাতে কী পরিমাণ অপচয়, তাহার কোনো সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান নাই। রাজনৈতিক প্রভাব, ট্রেড ইউনিয়নের অযাচিত হস্তক্ষেপ, অধিক জনবল, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, পেশাদারিত্বের অভাব, মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা, অধিক উৎপাদন ব্যয়—কত বিচিত্র ধরনের অপচয় ও অনিয়মের সিলসিলা চলিতেছেই। এই যে এত অর্থের অপচয় হইতেছে, অনিয়মের কারণে অর্থ আদায় কম হইতেছে, ইহা সবচাইতে বড় ভুক্তভোগী সরকার স্বয়ং। কারণ, ইউনিয়ন তথা তৃণমূল পর্যায় হইতে শুরু করিয়া উপর পর্যন্ত যেই পরিমাণ অর্থের অপচয় ও অনিয়ম হয়, তাহা সঠিক ব্যবস্থাপনায় হ্রাস করা সম্ভব হইলে রাষ্ট্রেরও রাজস্ব বৃদ্ধি পাইত, অর্থের অভাব হইত না। সরকারকেও অর্থের জন্য বড় বড় অর্থ সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরিতে হইত না।

বিভিন্ন ধরনের অপচয় তো আছেই; কিন্তু ছোটখাটো এমন অনেক অপচয় আছে যাহার সহিত আমাদের নৈতিকতা ও গা ছাড়া ভাব দায়ী। যাহারা যেই অফিসে বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তাহারা কি নিজেদের রুম হইতে বাহির হইবার সময় কখনো লাইট, ফ্যান বা এসি বন্ধ করেন? বাস্তবতা হইল, পিয়নের যখন সময় বা ইচ্ছা হইবে তখন এইগুলির সুইচ বন্ধ হইবে। অথচ অপচয় ও অপব্যয় একটি দেশকে ভিতর হইতে ক্ষয় করিয়া দেয়। বাঁশে বা কাঠে ঘুণ বা উইপোকা লাগিলে যাহা হয়—উপর হইতে সহজে চোখে পড়ে না, তেমনি করিয়া তৃণমূল হইতে উপর পর্যন্ত সমুদয় অপচয় একটি রাষ্ট্রের জন্য ঘুণ পোকার মতো; ভিতরে ভিতরে ক্ষয় করিয়া দেয়; কিন্তু উপর হইতে বুঝা যায় না।

অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করিতে দেশে দুদক, এনবিআর হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন সংস্থা রহিয়াছে। এই সকল সংস্থার নীতিনির্ধারকরা কি কখনো হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন, রাষ্ট্রের কী পরিমাণ অর্থ অপচয় হয় কেবল সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবে? এইরকম গা ছাড়া ভাব লইয়া চলিলে গরিব রাষ্ট্রগুলি উন্নতির সোপানে পা রাখিবে? কিংবা সেই সোপানে পা রাখিলেও অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কি পা পিছলাইয়া যাইতে পারে না? অপচয় ও অনিয়মের লাগাম টানিতে পারিলে আমরা হয়তো আরো একটি বাংলাদেশ গড়িয়া তুলিতে পারিতাম।